
অনন্য মনমাতানো সুবাস, জিভে জল আনা স্বাদ আর শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে অবশেষে আন্তর্জাতিকভাবে নিজের জাত চেনাল মানিকগঞ্জের বিখ্যাত ‘হাজারী গুড়’। জেলাটির হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি পণ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা লাভ করেছে। প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই লোকজ ঐতিহ্যটি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এক নতুন পরিচিতি পেল।
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যার দিকে মানিকগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা অত্যন্ত আনন্দের সাথে গণমাধ্যমকে এই গৌরবময় তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
হাজারী গুড়ের এই আন্তর্জাতিক প্রাপ্তি নিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, "জিআই সনদ পাওয়ার কারণে মানিকগঞ্জ জেলার ঐতিহ্য এ পণ্যের স্বকীয়তা আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত হয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ হবে।"
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এই ঐতিহ্যবাহী গুড়কে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন সনদপত্র ইস্যু করে। ডিপিডিটির মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের স্বাক্ষরিত ‘জিআই (আর) ফরম-১’ এর মাধ্যমে এই আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ডিপিডিটির চূড়ান্ত সনদপত্র অনুযায়ী, ‘মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়’ পণ্যটি এখন থেকে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের অনুকূলে ‘৩০ শ্রেণিতে’ এবং ‘জিআই-৬২’ নম্বরে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হলো।
এই গুড় তৈরির আদি বংশানুক্রমিক পরিবারের অন্যতম সদস্য শামিম হাজারী এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, "২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক রেহেনা আক্তার জিআই সনদের জন্য আবেদন করেন। ৫ অগাস্ট পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক মনোয়ার হোসেন মোল্লা, বর্তমান জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন।"
মানিকগঞ্জের ঝিটকা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা এবং পেশাদার গাছিদের মুখে মুখে এই গুড়কে নিয়ে নানামুখী লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, খোদ ইংল্যান্ডের প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও একদা এই হাজারী গুড়ের অপূর্ব স্বাদ গ্রহণ করে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। যদিও এই রাজকীয় প্রশংসার পেছনে কোনো লিখিত বা দাপ্তরিক প্রমাণ মেলেনি, তবুও এই ঐতিহাসিক গল্পটি আজও এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে পরম গর্বের সাথে ঘোরে।
হরিরামপুরের ঝিটকা অঞ্চলের অভিজ্ঞ গুড় উৎপাদনকারী রহিজ উদ্দিন ও মোজাফ্ফর হোসেন সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "জিআই সনদ পাওয়ায় হাজারি গুড়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। এতে নকল পণ্যের বিস্তার রোধ করা সহজ হবে এবং প্রকৃত উৎপাদকেরা লাভবান হবেন। একইসঙ্গে বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।"
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ডিপিডিটি সূত্র জানায়, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার বিশেষ আগ্রহ, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই হাজারী গুড়ের জিআই নিবন্ধনের এই জটিল প্রক্রিয়াটি দ্রুত গতি পায়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন অংশীজন ও মাঠপর্যায়ের গবেষকেরা ডিপিডিটির চাহিদামতো এই গুড়ের ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও আবেদন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সহযোগিতা প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলটি সুদীর্ঘকাল ধরে শীতকালে সংগৃহীত খাঁটি খেজুরের রস থেকে তৈরি এই বিশেষ জাতের সাদাটে গুড়ের জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। স্থানীয় গাছিদের বিশেষ উৎপাদন কৌশল, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও বংশানুক্রমিক দক্ষতার কারণে এই গুড় তার দানাদার গঠন ও রাজকীয় স্বাদের জন্য অনন্য। বিগত প্রায় ২০০ বছর ধরে এই জনপদের মানুষ তীব্র শীতের সকালে খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে বিশেষ কাঠের মুগুর দিয়ে ঘুঁটে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এই হাজারী গুড় প্রস্তুত করে আসছেন।