
শিক্ষার্থীদের ‘পোল্ট্রি (ব্রয়লার) মুরগি’ বলে সম্বোধন করার জেরে এবার তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে বরিশালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ ও নিঃশর্ত ক্ষমার দাবিতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা।
এ সময় আন্দোলনকারীদের ‘আমি কে, তুমি কে, মুরগি মুরগি’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ। দীর্ঘ সময় সড়ক আটকে রাখায় মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা।
ক্ষোভের মুখে ৬ দফা দাবি
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনের মহাসড়কে অবস্থান নেন ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা। একদিকে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার প্রতিকূল পরিস্থিতি, অন্যদিকে সোমবারের এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে বহুগুণ কঠিন হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায়ে ৬ দফার একটি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একের পর এক ত্রুটিপূর্ণ ও অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্তের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছে এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচ। দীর্ঘ আট বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হলেও প্রশ্নপত্রের অতিরিক্ত কঠিন মান এবং পরীক্ষার মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি না থাকাটা পুরোপুরি অযৌক্তিক।
বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যার মতো জটিল বিষয়গুলোর পরীক্ষার মাঝে মাত্র এক দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। এত কম সময়ে রিভিশন দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছেন। আন্দোলনকারীরা জানান, তারা কোনো অটোপাস বা মাঝপথে সিলেবাস পরিবর্তন চান না; বরং একটি বাস্তবসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব পরীক্ষা ব্যবস্থা চান, যেখানে প্রশ্নপত্রের মান যৌক্তিক হবে এবং সমস্ত ভুলত্রুটি সংশোধন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ৬ দফা দাবি:
১. যৌক্তিক কোনো কারণে পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
২. পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা অথবা গ্রহণযোগ্য কারণ সাপেক্ষে খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া।
৩. এইচএসসি-২০২৬ পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে হবে।
৪. প্রশ্নপত্রের সমস্ত ভুলত্রুটি অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে।
৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, সেখানে পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত রাখতে হবে।
৬. শিক্ষার্থীদের ‘পোল্ট্রি মুরগি’ বলে অপমানজনক মন্তব্য করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে প্রকাশ্যে দেশবাসীর সামনে ক্ষমা চাইতে হবে।
মাঠে নামা শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
আন্দোলনে অংশ নেওয়া বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী আলিফ নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কঠিন বিষয়গুলোর পরীক্ষার মাঝেও পর্যাপ্ত বিরতি দেওয়া হয়নি। অতীতের তুলনায় প্রশ্নপত্রও অনেক কঠিন হয়েছে।"
এমনকি সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন এসেছে দাবি করে তিনি আরও যোগ করেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বহু কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়ার মতো ন্যূনতম পরিবেশ ছিল না। অথচ দেশজুড়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও একটি বোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত রেখে বাকি বোর্ডগুলোতে পরীক্ষা জোরপূর্বক চালানো হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণেই তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান।
একইভাবে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থী এনামুল ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন:
"বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় শিক্ষামন্ত্রী আমাদের ‘ব্রয়লার মুরগি’ বলে মন্তব্য করেছেন। আমরা যদি দেশের ভবিষ্যৎ হই, তাহলে আমাদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য কীভাবে করা হলো? এ জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যথায় পদত্যাগ করতে হবে।"
প্রশাসনের তৎপরতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় পুলিশ প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাখাওয়াত হোসেন বলেন:
"কিছু শিক্ষার্থী তাদের দাবি নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।"