
কক্সবাজারে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে ঘিরে টানা দুই দিনের ঘটনাপ্রবাহে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রামুতে মোটরসাইকেল শোডাউন ও মিছিলের দাবি, উখিয়ায় কর্মী সমাবেশ এবং পরে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে মামলা—সব মিলিয়ে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
রোববার (২৬ জুলাই) সকালে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় মোটরসাইকেল শোডাউন ও মিছিল করেছে বলে দাবি করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। সংগঠনটির দাবি, সকাল ৭টার দিকে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের দিন শনিবার উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নে তাদের একটি কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
পরপর দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে রামুর শোডাউনটি রোববার অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে উখিয়ায় ছাত্রলীগের কর্মসূচির প্রতিবাদে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টার দিকে রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের স্বপ্নতরী পার্কসংলগ্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেলের একটি বহর কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে জোয়ারিয়ানালার দিকে যায়। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কর্মসূচির আগের দিন শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোডাউনের ঘোষণা দেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির রামু উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক উদ্দিন মিশুক।
মিশুক সাংবাদিকদের বলেন, রোববার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তারা একত্রিত হয়ে মিছিল করেন। তার দাবি, সে সময় রামুতে বৃষ্টি ছিল না; সকাল সাড়ে ৯টার পর বৃষ্টি শুরু হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী কর্মসূচিতে অংশ নেন। মিছিলে উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীন সরওয়ার কাজল এবং সদস্য কাওসার সাকিব নেতৃত্ব দেন। তার ভাষ্য, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।
তবে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া এ দাবির সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, প্রচারিত মোটরসাইকেল শোডাউন ও মিছিলের ভিডিওটি রোববারের নয়। তার যুক্তি, সকাল থেকেই রামুতে বৃষ্টি হচ্ছিল, অথচ ভিডিওতে আকাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তাই এটি আগের কোনো সময়ের ভিডিও হতে পারে, যা আজকের বলে প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে রামু উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম দাবি করেন, শোডাউনটি রোববার সকালেই হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এ কর্মসূচির প্রতিবাদে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি।
এর আগে শনিবার দুপুরে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নে ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রতিবাদে বিকেলে পালংখালী স্টেশন এলাকায় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
উখিয়ার ঘটনায় ১১৪ জনের নামে মামলা
উখিয়ায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের কর্মী সমাবেশকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে মামলা করেছে উখিয়া থানা পুলিশ।
রোববার উখিয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলার বাদী হন থানার এসআই পলাশ বড়ুয়া। মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, শনিবার দুপুরে কুতুপালং বাজার এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, পালংখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নলবুনিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদের বাড়িতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠক করছেন। সেখানে সরকার ও রাষ্ট্রের জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং টায়ার জ্বালিয়ে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
পরে উখিয়া থানার একাধিক টহল দল সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বৈঠকে থাকা ব্যক্তিরা পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় হলদিয়াপালং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মিলন বড়ুয়া (৪২) এবং আবু নাসের মোহাম্মদ ইমরান (২৪)-কে আটক করা হয়। অন্যরা পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের স্লোগান ও কর্মকাণ্ড থেকে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ও সমর্থক। তাদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী স্লোগান, মিছিল এবং নাশকতার পরিকল্পনার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, আটক দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদে বৈঠকে অংশগ্রহণ এবং অন্যদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পরে তথ্য যাচাই, অভিযান এবং পলাতকদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলায় উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, সহ-সভাপতি হুমায়ুন কবির চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ইমাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার কামাল পাশা, উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক তারেক হোসেন মানিকসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ১১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৫০-৬০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার মামলার তথ্য নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুইজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।