
মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা দমন-পীড়নের ৯ বছর আজ। দিনটিকে 'রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস' হিসেবে পালন করে আসছেন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা।
এ উপলক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে গণহত্যার বিচার এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে উখিয়ার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর)-র নামক একটি রোহিঙ্গা সংগঠন এই সমাবেশের আয়োজন করে। আয়োজনে এ সমাবেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। সমাবেশে বক্তারা ২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির বিচার এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান।
মিয়ানমারের আরাকানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে বক্তারা জানান। এজন্য তারা আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।
ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "২০১৭ সালের গণহত্যার দীর্ঘ ৯ বছর অতিক্রম হতে চললেও আমরা আজও কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাইনি। আমাদের প্রধান দাবি- আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে ফিরে যেতে চাই। তবে নাগরিকত্ব, সার্বিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো প্রকার লোক-দেখানো বা অপরিকল্পিত প্রত্যাবাসন আমরা মেনে নেব না।"
উখিয়ার ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি রশিদ উল্লাহ বলেন, “স্বদেশে ফিরতে মন চায়। কিন্তু কীভাবে ফিরব? মিয়ানমারের ওপারে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ চলছে, আমাদের ঘরে ফেরে এখনো অনিশ্চিত।”তবে দ্রুত প্রত্যাবাসনের দাবি জানান এই রোহিঙ্গা নেতা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন অঞ্চলের মংডু, বুচিথং ও রাসেথং জেলার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতন শুরু করে। সে সময় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঢল নামে। তখন সীমান্ত অতিক্রম করে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেয়। ওই দিনটিকে স্মরণে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা 'রোহিঙ্গা জেনোসাইড রিমেম্বার ডে' পালন করে আসছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আয়োজিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, "ক্যাম্পের ভেতর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপিবিএনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ শান্তি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।"
সমাবেশে রোহিঙ্গারা ‘গণহত্যার বিচার চাই’, ‘নিরাপদ প্রত্যাবাসন চাই’ এবং ‘নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই’ সহ বিভিন্ন দাবি সংবলিত স্লোগান দেন।
তবে সাম্প্রতি , নয় বছর পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে তার মধ্যে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার বলেছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন গ্রহণের বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে সংশয়ও রয়েছে বর্তমান জান্তা সরকারের সাথে ঢাকার আলোচনা চললেও আরাকানের ৮০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির দখলে, এতে রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরা আরো জটিল হতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।