
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে সকালে বাড়ি থেকে বের হয় তিন সহপাঠি স্কুলছাত্রী। কিন্তু স্কুলে না গিয়ে তারা প্রথমে চলে যায় পাবনা বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে বাসে নাটোর, এরপর রংপুর হয়ে কুড়িগ্রাম। লক্ষ্য ছিল সীমান্ত এলাকার দিকে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত অপরিচিত এলাকায় পথ হারিয়ে ফেলায় তাদের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের সহায়তায় উদ্ধার করা হয় তিন স্কুলছাত্রীকে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তিন কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পাবনা সদর থানা পুলিশ। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনা ঘটে।
তিন কিশোরীই পাবনা সদর উপজেলার চর আশুতোষপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের একজন অষ্টম শ্রেণিতে এবং দু'জন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তারা একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে দু'জন পরস্পরের আত্মীয়।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তিন পরিবারের আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক। অভিভাবকদের কেউ ফার্নিচারের কাজ করেন, কেউ আবার ওয়ার্কশপে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, তিন কিশোরীর একজন দীর্ঘদিন ধরে নিজের চেহারা ও চোখের সমস্যা নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছিল। এতে তার মধ্যে ক্ষোভ ও অভিমান তৈরি হয়। একপর্যায়ে সে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে। অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীতদল BTS-এর প্রতিও তার আগ্রহ তৈরি হয়। ওই কিশোরী সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা তার দুই সহপাঠীকে জানায়। পরে তারাও তার সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রবিবার সকাল দশটার দিকে তিনজন স্কুলে এসে একত্র হয়। এরপর ক্লাসে না গিয়ে অটোরিকশায় করে পাবনার অনন্ত মোড় এলাকায় যায়। সেখান থেকে আরেকটি অটোরিকশায় পাবনা বাস টার্মিনালে পৌঁছে বাসে ওঠে। বাসে তারা প্রথমে নাটোরে যায়। সেখান থেকে রংপুর হয়ে পরে কুড়িগ্রামে পৌঁছায়।
পরিবারের দাবি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাদের একজন পরিবারের গচ্ছিত প্রায় এক লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে কুড়িগ্রাম বাস টার্মিনালে পৌঁছে তিন কিশোরী রাত কাটানোর জন্য থাকার জায়গা খুঁজতে থাকে। এ সময় খুঁজতে খুঁজতে তারা একটি অপরিচিত মহল্লায় ঢুকে পড়ে। সেখানে তাদের গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের।
ওই মহল্লায় বসবাস করেন কুড়িগ্রাম সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাজ উদ্দিন। তার স্ত্রী অপরিচিত তিন কিশোরীকে দেখতে পেয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিশোরীদের কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হওয়ায় তিনি তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়।
পরে বিষয়টি এসআই তাজকে জানানো হলে তিনি ও তার স্ত্রী কৌশলে কিশোরীদের কাছ থেকে পরিবারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিশোরীদের অবস্থানের কথা জানান। একইসঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে অবহিত করা হয়।
এদিকে তিন কিশোরী বাড়িতে না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাদের সন্ধানে পাবনা সদর থানায় পৃথকভাবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। একই বিদ্যালয়ের তিন নাবালিকা একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাদের উদ্ধারে তৎপর হয় পাবনা জেলা পুলিশ।
পরে কুড়িগ্রাম সদর থানার এসআই তাজের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিন কিশোরীর অবস্থান নিশ্চিত করে পাবনা পুলিশ। কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের সহায়তায় তাদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুল ইসলাম বলেন, তিন কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ কাজ করে।কুড়িগ্রাম সদর থানার একজন উপপরিদর্শকের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে কুড়িগ্রাম পুলিশের সহযোগিতায় তিন কিশোরীকে নিরাপদে উদ্ধার করে পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।