
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণ (২১) নামে আরও এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১৪। তদন্তে জানা গেছে, আলিফকে ছয়টি গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এর আগে গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং তাঁর হেফাজতে অস্ত্রভর্তি একটি ব্যাগ ছিল বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
নতুন এই গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, ব্যবহৃত অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল, হত্যার নির্দেশদাতা কে এবং কী কারণে আলিফকে হত্যা করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে দুর্গাপুর পৌর শহরের শহীদ মিনার এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি-১৪ জানায়, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার অধিযাচনের ভিত্তিতে তাদের ময়মনসিংহ সদর কোম্পানির একটি দল রাত পৌনে ১২টার দিকে শহীদ মিনার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায়। এ সময় আলিফ হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁকে দুর্গাপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার সাকের আহমেদও প্রাঙ্গণের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এসআরবির অভিযানে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে আদালতে পাঠানো হবে।
অপূর্বর রিমান্ডে পাওয়া তথ্য যাচাই করছে পুলিশ
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর রাতে এই মামলায় সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব নামে আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত প্রথমে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে আরও চার দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপূর্বর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে একাধিক সূত্র ধরে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অপূর্ব হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হেফাজতে অস্ত্রভর্তি একটি ব্যাগও ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তের অংশ; সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে যুক্ত সিআইডি ও পিবিআই
ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান মঙ্গলবার বিকেলে জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার তেলঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
পরদিন তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়।
আলিফ স্থানীয় আইপি টেলিভিশন ‘রূপসী বাংলা’র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অনিয়ম, অপরাধ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।
তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত একটি পুরোনো ভিডিওতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায় তাঁকে।
হত্যার নির্দেশদাতা ও অস্ত্রের উৎস খুঁজছে তদন্তকারীরা
আলিফ হত্যার পরপরই এসআরবি-১৪ জানিয়েছিল, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কাজ চলছে।
অপূর্বর গ্রেপ্তার, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং এবার আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণের গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং কারা সরাসরি এতে অংশ নিয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ডিজিটাল তথ্য ও অন্যান্য আলামতের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করছেন। একই সঙ্গে ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস এবং হত্যার নির্দেশদাতাকে শনাক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এসআরবি-১৪ জানিয়েছে, মামলার অন্য পলাতক সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।