
স্বাদে ও পুষ্টিগুণে ভরপুর আর রান্নায় বহুমুখী সবজির এক অনন্য নাম পটল। ভাজি, দোলমা কিংবা ঝোলে প্রতিটি পদেই পটল এনে দেয় আলাদা স্বাদ।
গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা প্রায় সারাবছরই এর চাহিদা থাকে বাজারে। অথচ পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়িতে এই জনপ্রিয় সবজিটির চাষ একসময় ছিল না বললেই চলে। সেই শূন্যতায় আশার বীজ বপন করে পাহাড়ি জনপদে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জেলার মাটিরাঙ্গা সদরের কৃষি উদ্যোক্তা মো. আনোয়ার হোসেন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তিনি আজ এলাকার সফল কৃষকদের রোল মডেল।
২০২৪ সালের শুরুতে ইউটিউবে পটল চাষের ওপর একটি ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন। পরে নওগাঁ থেকে প্রতি পিস ১৭ টাকা দরে বারি-১ ও বারি-২ জাতের ১০০টি লতার চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষা মূলক চাষাবাদ শুরু করেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত পটলের একটি উচ্চ ফলনশীল জাত। এটি বহুবর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ।
প্রথাগত চাষাবাদের ধরা-বাঁধা নিয়ম ভেঙে নিজের ১০ শতক ধানের জমিতেই বাঁশ ও সুতার মাচা তৈরি করে রোপণ করেন সেই চারা। চারা লাগানোর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই গাছ থেকে পটল তোলা শুরু হয়।
জমি তৈরি থেকে চারা কেনা, জৈব সার, বালাইনাশক, ফেরোমন ট্রাপ এবং মাচা তৈরিসহ ১০ শতক জমিতে তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। অনুকূল আবহাওয়া ও সঠিক পরিচর্যায় বর্তমানে প্রতি ১০ শতক জমি থেকে মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি পর্যন্ত পটল উৎপাদিত হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে শীতের সবজি বাজারে আসায় তা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
শুধু পটল চাষেই থেমে থাকেননি আনোয়ার। নিজের ১ একর বর্গা নেওয়া জমিতে পটলসহ বিভিন্ন মিশ্র সবজির চাষ করছেন। তার সবুজ সমারোহে শোভা পাচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও পেঁপের গাছ। এর মধ্যে শুধু কপির চারা রোপণ করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার পিস। চারা রোপণ থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কপির পেছনে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা খরচ হয়েছে। মিশ্র এই চাষাবাদে প্রতি ১০ শতক জায়গায় মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা পরিচর্যা খরচ হয়।
আনোয়ারের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের গল্প। তার বা এলাকার অন্য চাষিদের কারও নিজেদের এক ইঞ্চিও চাষযোগ্য জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে একরপ্রতি ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করে এই লাভজনক সবজি চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
কৃষি উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, " ইউটিউব দেখতে গিয়ে হঠাৎ এক দিন পটল চাষের প্রতিদেন টি তার চোখে পড়ে। এতে অনুপ্রানিত হয়ে ব্যতিক্রমী সবজি পটল চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। চাষের শুরুতেই ফলন ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ব্যতিক্রমী কিছু করার চিন্তা রয়েছে বলে জানান তিনি।"
আনোয়ারের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় চরপাড়ার আরেক কৃষক বাচ্চু মিয়াও ১০ শতক জমিতে পটল চাষ শুরু করেছেন। এছাড়া ওয়াছু এলাকার ছাত্তার নামের আরেক কৃষকও ১০ শতক জমিতে পটল চাষে হাত দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে তিনটি ভিন্ন স্থানে মোট ৩০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পটল চাষ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্লকের দায়িত্বে থাকা কৃষি উপ-সহকারী দেবাশীষ চাকমা বলেন, "আনোয়ার অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। তিনি নিজে থেকেই বারি-১ ও বারি-২ জাতের পটল চাষ শুরু করেন। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।"
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, "ধানের জমিতে মাচা তৈরি করে পটল চাষ এবং বর্গা জমিতে মিশ্র ফলন ফলানোর বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া শাকসবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ ধরনের উদ্যোগী কৃষকদের আমরা কারিগরি সহায়তা, মানসম্মত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি। আনোয়ারের এই সাফল্য এলাকার বেকার যুবকদের কৃষিতে আত্মনির্ভরশীল হতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।"