
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িসহ অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা আড়াইটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকরা। কিছুক্ষণের মধ্যে আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা তাদের সঙ্গে যোগ দিলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে মহাসড়কের দুই পাশে তীব্র যানজট তৈরি হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বেতন দিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। আগের তুলনায় ওভারটাইমের সুযোগও কমে গেছে। অন্যদিকে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের আয় বাড়েনি। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
ইন্টারস্টপ অ্যাপারেল লিমিটেডের লাইনম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, সারা দিন কাজ করেও যে বেতন পাওয়া যায়, তা দিয়ে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, অথচ শ্রমিকদের বেতন আগের অবস্থাতেই রয়েছে। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়েছে। তারা কাজ করতে চান, তবে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার মতো মজুরিও প্রয়োজন।
কারখানার শ্রমিক ও শিল্প পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে কোনাবাড়ী, মৌচাকসহ শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। এরই মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ উদ্যোগের পরও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ কমেনি।
শনিবার দুপুরে টিফিন বিরতির সময় কাজে ফিরে না গিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন ইন্টারস্টপের শ্রমিকরা। পরে আশপাশ থেকে ময়লা-আবর্জনার বস্তা এনে সড়কে ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। একপর্যায়ে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইলের শ্রমিকরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। এতে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসব কারখানার ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের একাংশও বিক্ষোভে যোগ দেন।
খবর পেয়ে থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বেলা আড়াইটা থেকে শুরু হওয়া অবরোধে মহাসড়কে আটকা পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকরা।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ির সামনের কাচসহ অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে সরে গেলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহত শ্রমিকদের কয়েকজন স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এদিকে ডিভাইন টেক্সটাইলের শ্রমিক কবির হোসেনের অভিযোগ, পুলিশের লাঠিপেটায় তাদের ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। টিয়ারশেলের আঘাতেও অনেকে আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আন্দোলন বন্ধ হচ্ছে না জানিয়ে কবির বলেন, শনিবারের কর্মসূচি শেষ হলেও রোববার সকাল থেকে আবার বিক্ষোভ শুরু করবেন তারা।