
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হাইকোর্টে একটি বিশেষ ডেডিকেটেড বেঞ্চ গঠনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের উত্থাপিত এক বিশেষ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী আজ এই ঐতিহাসিক সবুজ সংকেত দিয়েছেন।
আজ রোববার (৭ জুন) আপিল বিভাগের এজলাসে প্রধান বিচারপতির কাছে এই প্রস্তাব পেশ করা হয়। পরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল আশা প্রকাশ করে বলেন, এই বিশেষ উদ্যোগের ফলে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা আপিল জট ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটবে।
অতি সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টি করা শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার নিম্ন আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘অতি সম্প্রতি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে নির্মম হত্যাকাণ্ড-শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের যে মামলা, তার রায় ৭ জুন প্রকাশিত হয়েছে, যা ঘোষিত হয়েছে নিম্ন আদালত কর্তৃক এবং দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’
তবে উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট) চূড়ান্ত অনুমোদন বা ডেথ রেফারেন্সের সিদ্ধান্ত ছাড়া এই দণ্ড যে কার্যকর করা সম্ভব নয়, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয় কিন্তু মানুষ এই রায় কার্যকর হতে দেখতে পায় না বিলম্বের কারণে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘আমরা যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা সবসময় বলে থাকি, যতক্ষণ না সেই শাস্তি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রায়ের ব্যাপারে মানুষের শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমি উন্মুক্ত আদালতে মাননীয় প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে এটি এনেছি।’
উন্মুক্ত আদালতে বিষয়টি উপস্থাপনের পর প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলে জানান রাষ্ট্রের এই শীর্ষ আইন কর্মকর্তা।
বিশেষ বেঞ্চের কার্যকারিতার বিষয়ে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে এই জাতীয় মামলা, অর্থাৎ শিশু রামিসা, আছিয়া এবং রসু খাঁ মামলাগুলো শুনানির জন্য হাইকোর্টে একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করবেন, যেটি আগামী রবিবার থেকে কার্যকর হবে।’
এই বিশেষ বেঞ্চে শুনানির গতি ধরে রাখতে কোনো ধরনের সময় আবেদন করা হবে না জানিয়ে কাজল বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে আমাদের নিয়োজিত আইন কর্মকর্তারা কোনো মামলায় কোনো রকম অ্যাডজর্নমেন্ট চাইবেন না। কোনো অ্যাডজর্নমেন্ট ছাড়াই এই মামলাগুলো শুনানির জন্য আমি আমাদের আইন কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি।’
সাধারণত আদালতের ছুটির সময়ে বিচারিক গতি থমকে গেলেও এবার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিচার বিভাগের ওপর সাধারণ মানুষের ভরসা আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের বিচারিক আদালতগুলোতে ছুটি চলছে। এই ছুটির মধ্যেও নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং আদালতের কার্যক্রম মাননীয় প্রধান বিচারপতি অব্যাহত রেখেছেন।’
প্রধান বিচারপতির এই তড়িৎ পদক্ষেপকে ‘মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিচারকে ত্বরান্বিত করার জন্যে, মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য, বিশেষ করে আদালতের প্রতি মানুষের যে আস্থা সে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আজকে যে উদ্যোগটি গ্রহণ করেছেন, সেটিও একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
আলোচিত রামিসা মামলার তদন্ত ও বিচারিক কাজ রেকর্ড সময়ে সম্পন্ন করার জন্য সরকারপ্রধান ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে সাধুবাদ জানিয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই যে, তিনি রামিসার পরিবারের কাছে গিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করার জন্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা করণীয় করবেন বলেছিলেন।’
তবে কেবল বহুল আলোচিত বা মিডিয়া ট্রায়াল হওয়া মামলা নয়, বরং দেশের প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রেই সমান আইনি তৎপরতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো একটা মামলা আলোচিত হলেই আমরা সেটার পেছনে ছুটি, এটাও সত্য বাস্তবতা আমাদের মতো দেশে। কিন্তু প্রত্যেকটি অপরাধ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই অপরাধের বিচার, অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় আনা এবং তাদের শাস্তির মুখোমুখি করা, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’