স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে অগ্রণী ব্যাংককে এগিয়ে নিতে চাই
- ফরিদ শ্রাবণ
- প্রকাশঃ ১০:০৯ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ এ কর্মকর্তা এক সময় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সবশেষ ঢাকা ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন তিনি। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনীতির নানা শাখায় কাজ করেছেন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী এ অর্থনীতিবিদ।
সম্প্রতি ঢাকাওয়াচকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। কথা বলেছেন দেশের ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি, ডলার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্তবর্তীকালীন সরকার নিয়ে। জানিয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক নিয়ে নানা পরিকল্পনা, পাশাপাশি এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী, এ বিষয়েও মত দিয়েছেন তিনি।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকাওয়াচ২৪.কমের স্টাফ রিপোর্টার ফরিদ উদ্দিন শ্রাবণ।
ঢাকাওয়াচ: অনেক চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব নিলেন। ৬ মাসে কতটুকু সফল হয়েছেন?
আবু নাসের বখতিয়ার : ব্যাংক সেক্টরে গত ১৫ বছর যেভাবে লুটপাট হয়েছে, যেভাবে লেফট এন্ড রাইট ল্যান্ডিং হয়েছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো নট ইজি। কিন্তু দায়িত্ব যখন নিয়েছি কাজ করবো, করতে হবে। সফল অবশ্যই হবো। দৃশ্যমান সফলতার জন্য আর কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে, সরকারকেও সময় দিতে হবে।
ঢাকাওয়াচ: ঋণখেলাপীদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
আবু নাসের বখতিয়ার : আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঋণখেলাপীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাদের ব্যবসায় করার সুযোগ দিতে হবে। তারা গত কয়েক বছর অস্থিতিশীল পরিবেশের মাঝে ব্যবসায় করেছেন। তবে এখন ব্যবসায়ের জন্য স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, ঋণখেলাপীদের ব্যবসায় করার সুযোগ দিতে হবে। ব্যাংকটিকে ভালো করার জন্য ঋণখেলাপিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে যাচ্ছি।’
ঢাকাওয়াচ: আপনি তো এক সময় অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ছিলেন। এখন আবার চেয়ারম্যান হয়েছেন। ব্যাংকটির কোন তফাৎ দেখছেন কী?
আবু নাসের বখতিয়ার : আমি যখন ২০০৪ সালে এমডি হিসেবে আসি তখন ব্যাংকের ইক্যুইটি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। খেলাপি ঋণ ছিল আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। আর নিট মুনাফা দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। তবে ২০১০ সালে বিদায় নেওয়ার আগে ইক্যুইটি এক হাজার ৭২ কোটি টাকা ইতিবাচক ছিল। খেলাপি ঋণ কমিয়ে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর ৩৫২ কোটি টাকা মুনাফা ছিল। কিন্তু এখন আবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে দেখি মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। গত ১৫ বছর ঋণ ঠিকভাবে বিতরণ না করার কারণে এ পরিস্থিতি হয়েছে। তবে সহসায় এই সংকট কেটে উঠবো।
ঢাকাওয়াচ : মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল অবস্থায় রাখার উপায় কী?
আবু নাসের বখতিয়ার : মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়ে ১১ শতাংশ ছিল। সেখন থেকে কমে এখন সিঙ্গেল ডিজিটে আছে। অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নর চেষ্টা করছেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। জুনের মধ্যে ৬-৭ শতাংশে নেমে আসবে, আমার বিশ্বাস মূল্যস্ফীতি অবশ্যই আরও কমে আসবে।
ঢাকাওয়াচ: প্রাইভেট ব্যাংকের চেয়ে পাবলিক ব্যাংকের প্রতি আস্থা বাড়ছে। বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?
আবু নাসের বখতিয়ার : আমি মনে করি, পুরো ব্যাংক সেক্টর মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তবে সরকারের কারেন্ট পলিসির কারণে আস্তে আস্তে আস্থা ফিরে আসছে।
ঢাকাওয়াচ: তারল্য সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
আবু নাসের বখতিয়ার : বর্তমানে তারল্যসংকট বড় সমস্যা। সবাই ব্যাংকে যায় টাকা উঠানোর জন্য অর্থাৎ ডিপোজিটের চেয়ে উত্তোলন বেশি। তার মানে এই নয় যে, তারল্য সংকটে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আশা করছি, জুনের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে। বাহির থেকে ফরেন কারেন্ট ইনভেস্টমেন্ট আসার কথা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইডিবি ফান্ড আসলে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। তবে আমাদের রিজার্ভও বলে রিসেন্টলি ১৯ বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়নের উপরে অবস্থান করছে।
ঢাকাওয়াচ : রেমিটেন্স আহরণে অগ্রণী ব্যাংক কেমন কাজ করছে?
আবু নাসের বখতিয়ার : গত ডিসেম্বরে প্রবাসী আয় আনার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক। টপ টেন রেমিট্যান্স আহরণে দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন করে। ওই মাসে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। আমরা চেষ্টা করছি সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের। তবে ইসলামিক ব্যাংককে বিট করা বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকাওয়াচ : পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা সম্ভব কি? যদি ফেরত আনা যায় কীভাবে সম্ভব?
আবু নাসের বখতিয়ার : অবৈধভাবে যে টাকা পাচার হয়েছে তা ফেরত আনা সম্ভব। তবে তার আগে প্রমাণ করতে হবে টাকা অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। লিগ্যাল ওয়েতে গেলে সে টাকা আনা সম্ভব নয়, যেমন একজন মানুষ পাসপোর্টের সাথে এন্ডোস করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডলার সাথে নিয়ে বিদেশ যেতে পারে। এটা লিগ্যাল ওয়ে। তার বেশি নিতে গেলে স্পেশাল পারমিশন দরকার। আর সে পারমিশন না থকলে টাকা নেয়া যাবে না। অবৈধ টাকা অবৈধ ওয়েতে যে দেশে পাচার হয়েছে, সে দেশের সাথে চুক্তি করে ফেরত আনা সম্ভব। তবে তার আগে প্রমাণ করতে হবে অবৈধ টাকা অবৈধ ওয়েতে পাচার হয়েছে। এসআলম, সামিট, বেক্সিমকো হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে, আসলে এই টাকা ফেরত আসা উচিত।
ঢাকাওয়াচ : সম্প্রতি ধানমন্ডি৩২ বাড়ি ভাঙ্গা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য জানতে চাই?আবু নাসের বখতিয়ার : আমি ব্যক্তিগতভাবে ধানমন্ডি ৩২ কেন কোন ভাঙচুর পছন্দ করিনা। আমার কথা হলো কেউ যদি অপরাধ করে তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত, ভাঙচুর সমাধান নয়।
ঢাকাওয়াচ : অগ্রণী ব্যাংক নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আবু নাসের বখতিয়ার : আমি চাইব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব কর্মকর্তা-কর্মচারী হাতে হাত কাঁধে কাধ মিলিয়ে এ ব্যাংককে এগিয়ে নিতে। তবে তার জন্য তিনটা কোয়ালিটি প্রয়োজন। সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা। এই তিনটি গুণ থাকলে আমরা অগ্রণী ব্যাংককে বহু দূর এগিয়ে নিতে পারব। এই বিশ্বাস আমার আছে।