
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পুঁজিবাজারে দেখা দিয়েছে নতুন উচ্ছ্বাস। দুপুর ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৬৯ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৫,৫৬৯ পয়েন্টে। এ সময় পর্যন্ত লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭১৪ কোটি টাকা, যা বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) লেনদেন শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টাতেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের বড় উত্থান বিনিয়োগকারীদের সেই আশাবাদেরই প্রতিফলন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। এর প্রভাবেই বাজারে চাঙাভাব ফিরে এসেছে।
বিশেষ করে বিএনপির নেতা ও স্পন্সরদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোম্পানির শেয়ারদর এদিনের উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ারদর ৯.৭৬ শতাংশ বেড়ে ৪.৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফেনী-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে জয়ী হওয়া ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে ব্যাংকটির সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মিন্টুর মালিকানাধীন তালিকাভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও দরবৃদ্ধি দেখা গেছে। কে অ্যান্ড কিউয়ের শেয়ার ৫.২২ শতাংশ বেড়ে ৪৫৫.৩ টাকা, প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার ৪.৩৩ শতাংশ বেড়ে ৭৯.৬ টাকা এবং দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলসের শেয়ার ২.৯৫ শতাংশ বেড়ে ১৩৬.১ টাকায় পৌঁছেছে।
ঢাকা ব্যাংকের শেয়ারদর ৯.৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪.৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ব্যাংকটির একজন উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার এবং তার ছেলে ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
টেক্সটাইল খাতের মুন্নু ফেব্রিক্সের শেয়ার ৯.৮৭ শতাংশ বেড়ে ২৪.৫ টাকায় উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আফরোজা খানম মানিকগঞ্জ থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
একই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মুন্নু সিরামিকের শেয়ার ৭.৯৩ শতাংশ বেড়ে ৮৯.৮ টাকা এবং মুন্নু অ্যাগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারিজের শেয়ার ৪.৭৩ শতাংশ বেড়ে ৩৮৭.৮ টাকায় লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া একমি ল্যাবরেটরিজ, কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ ও ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির মতো বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিপরীত প্রবণতা দেখা গেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারদর ২.৩ শতাংশ কমে ৫০.৯ টাকায় নেমেছে। ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ২.৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩৮ টাকায়।
শেয়ার ব্যবসায়ীদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে স্পষ্টভাবে প্রভাবিত করেছে। বিএনপির বড় জয় দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কেনায় আগ্রহ বাড়িয়েছে। বিপরীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ টিবিএসকে বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের ওপর বিনিয়োগকারীরা জোরালো আস্থা দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, এ আস্থার ফলেই বাজারে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে এবং ডিএসইর প্রধান সূচকেও বড় উত্থান দেখা গেছে। সামনের দিনগুলোতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে আবু আহমেদ জোর দিয়ে বলেন, বাজারের এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখা শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করবে।
আইসিবি চেয়ারম্যান বলেন, এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে সুদহার যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনা, ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি, দেশি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং সময়মতো কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা।
তিনি আরও বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে এসব চ্যালেঞ্জ কতটা কার্যকর ও দ্রুত মোকাবিলা করা হচ্ছে তার ওপর।
আবু আহমেদ জানান, অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য কয়েকটি শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে চিহ্নিত করেছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছে। তার আশা, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার এই উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেবে। তার মতে, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে না এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে।
তাই যিনিই পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিন, তাকে এ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন আবু আহমেদ।