
দেশের ব্যাংক খাতে ঋণের অবস্থা মারাত্মক হওয়ার কারণে এবার কিছু ব্যাংককে লভ্যাংশ বিতরণে বাধা দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে, যতই মুনাফা থাকুক, ওই ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এই হিসাব করা হবে হিসাব বছরের শেষের তথ্য অনুযায়ী।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি খাতের ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ঘরে, যা মোট তপশিলি ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৭টি ব্যাংক শুধু উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে এবার লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এছাড়া মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংকরা গত বছর থেকেও লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারছে না।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্ত করার জন্য ২০২৫ সালের জন্য লভ্যাংশ বিতরণের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালীন গত বছরের ১৩ মার্চ এই বিধান জারি করা হয়। এর আগে ২০২০ সালের করোনাকালে কিছুটা কড়াকড়ি করা হয়েছিল মূলত প্রভিশন সংরক্ষণ ও ডেফারেলের কারণে। তবে এবার লভ্যাংশ বিতরণে আরও কড়া শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক যত মুনাফা করুক, যদি শ্রেণীকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তবে লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না। প্রভিশন, সিআরআর ও এসএলআর ঘাটতি, দণ্ড সুদ ও জরিমানা অনাদায়ী থাকলেও লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না। লভ্যাংশ শুধুমাত্র বিবেচ্য হিসাব বছরের নিট মুনাফা থেকে দেওয়া যাবে, পুঞ্জীভূত মুনাফা থেকে নয়। এছাড়া পরিশোধিত মূলধনের সর্বাধিক ৩০ শতাংশ বা নিট মুনাফার সর্বাধিক ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া যাবে।
বর্তমান সরকারের সময় ব্যাংক খাতে গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মোস্তাকুর রহমানের অধীনে এই নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। হিসাব বছরের শেষ হওয়ার চার মাসের মধ্যে সাধারণভাবে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করা হয়। লভ্যাংশের পাশাপাশি কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো শিথিলতা চেয়েছে, বিশেষ করে যেসব ব্যাংক নিট মুনাফা করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে আদায় জোরদার ও বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধার কারণে তা কমে ডিসেম্বর শেষে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছে, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে ৬১টি তপশিলি ব্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি। শুধু উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ১৭টি ব্যাংক এবার লভ্যাংশ দিতে পারবে না। সরকারি ৯টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল রূপালী ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। রূপালীর খেলাপি ঋণ ১৯,৬৩১ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৪১.৫৮ শতাংশ। অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোরও খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। সর্বোচ্চ জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৪ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক (৫টি ব্যাংকের সমন্বয়) সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ দেখাচ্ছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৭.৬৪ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৯৬.৪৩ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৯৬.২৭ শতাংশ, এসআইবিএল ৮০.৩৮ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংক ৬২.৪৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংক ৫৩.১২ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ৫১.৯৯ শতাংশ, এবি ব্যাংক ৫০.৮৮ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৯২,১১৫ কোটি টাকা বা ৪৯.৩৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি। প্রিমিয়ার ব্যাংক ৩০.৪৪%, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২২.৪৬%, এনআরবিসি ১৭.১১%, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ১৫.৮৩%, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংক ১৫.০৪%, ওয়ান ব্যাংক ১৩.৪৯% এবং ইউসিবি ১১.৬৯% খেলাপি ঋণ দেখাচ্ছে। বিদেশি মালিকানার ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের খেলাপি ঋণ শতকরা ৯৮%।
এই অবস্থার কারণে দেশের ব্যাংক খাতে লভ্যাংশ বিতরণে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যা আগামী হিসাব বছরের জন্যও প্রযোজ্য।