
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে, আর সেই অভিঘাতে বাংলাদেশকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর আশঙ্কা—দেশটি বিশ্বের প্রথম তেলশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান টানা ৩৩ দিনে গড়িয়েছে। এই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে এবং তেলের দাম পৌঁছেছে অস্বাভাবিক উচ্চতায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশ বিকল্প পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বুধবার (১ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটি মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকটের প্রভাব এখানে বেশি তীব্র হতে পারে।
এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকটের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বহু মোটরসাইকেলচালক ও পরিবহনকর্মীকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি নিতে দেখা যাচ্ছে, আবার অনেকেই খালি হাতেই ফিরছেন।
জ্বালানি পাম্পগুলোতে সরবরাহ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি রেশনিংয়ের পরিকল্পনা করছে। ডিজেল বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা এবং প্রয়োজনে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। যদিও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কিছু বিধিনিষেধ সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছিল, সামগ্রিক সংকট এখনও কাটেনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে অপরিশোধিত তেলের মজুত অত্যন্ত সীমিত—এতে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ সম্ভব। একইভাবে ডিজেল ও অকটেনের মজুতও দ্রুত কমে আসছে; মার্চের শুরুতে ডিজেলের মজুত ছিল মাত্র ৯ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো।
এ অবস্থায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে তৎপর হয়েছে সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই বলে দাবি করছে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে।