
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছুঁতে পারে। এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে, যদিও বিশ্লেষকদের মতে এ পরিস্থিতির সম্ভাবনা এখন প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম প্রায় ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। শুধু মার্চ মাসেই অপরিশোধিত তেলের দাম ৫১ শতাংশ বেড়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় উত্থান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার পেরিয়ে গেছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যে নিত্যপণ্য, পরিবহন ও বিমান ভাড়ায় পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতির মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন হরমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হবে। একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধ জুন পর্যন্ত গড়ালে তেলের দাম সাময়িকভাবে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাদের একজন কৌশলবিদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলেও যদি হরমুজ আংশিক বন্ধ থাকে, তেলের দাম ২০০ ডলারে যাওয়া অস্বাভাবিক হবে না।’
তেলের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছালে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম তখন গ্যালনপ্রতি ৭ ডলারের কাছাকাছি উঠে যেতে পারে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দাম বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে চাহিদা কমে গিয়ে বাজারে ভারসাম্য ফিরবে, তবে সেই সীমা ঠিক কোথায় তা অনিশ্চিত।
সরবরাহ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসেই বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি সরবরাহ কমেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে বাধ্য হয়ে জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করতে হতে পারে, যা ১৯৭০-এর দশকের মতো জ্বালানিসংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
তবে এসব পূর্বাভাস নিয়ে ভিন্ন মতও আছে। এক কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যুদ্ধ কখন শেষ হবে বা উত্তেজনা কখন কমবে, তা নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।’ অতীতে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ভেস্তে যাওয়ার উদাহরণও তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা তিনটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছেন। উত্তেজনা দ্রুত কমে এলে এ বছর তেলের গড় দাম থাকতে পারে প্রায় ৭৭ ডলারের আশপাশে। যুদ্ধ দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ হলে গড় দাম হতে পারে প্রায় ৯২ ডলার। তবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারগুলো ইতিমধ্যে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়াসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বর্তমান সংকটের তুলনায় অপ্রতুল। সবকিছু মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখন হরমুজ প্রণালির দিকেই তাকিয়ে আছে। এই পথ যতদিন অস্বাভাবিক থাকবে, ততদিন তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই যাবে।