
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বিমানভাড়া হঠাৎ করে আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে, ফলে যাত্রীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে এবং এভিয়েশন খাতও পড়ছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায়। সাম্প্রতিক সময়ে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিটি টিকিটে গড়ে প্রায় হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া বেড়েছে, যা সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
নিয়মিত যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসছে চাপে পড়া বাস্তবতা। একজন শিক্ষক-গবেষক বলেন, ‘আগে যে টাকায় যাওয়া-আসা করতাম, এখন সেই টাকায় এক দিকের টিকিটও হয় না।’ আরেক যাত্রী জানান, ‘চিকিৎসার জন্য নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়, কিন্তু ভাড়া এমন বেড়েছে যে দুশ্চিন্তায় আছি।’ আগে যেখানে ঢাকা-রাজশাহী বা কক্সবাজার রুটে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় টিকিট মিলত, এখন সেখানে ৭ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকার নিচে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক রুটেও একই চিত্র। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ বা আমেরিকা যাত্রার ক্ষেত্রে টিকিটের দাম এক লাফে দ্বিগুণ থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকার টিকিট ২ থেকে আড়াই লাখ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণকারীদের বিকল্প রুট বেছে নিতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি অর্থ।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জেট ফুয়েলের দাম। মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে দেশে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১০৭ টাকা বেড়েছে, যা বৃদ্ধি হিসেবে প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এই দাম অনেক বেশি। ফলে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা ভাড়া সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এয়ারলাইনস সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জ্বালানির দাম কয়েক সপ্তাহে দ্বিগুণ হয়েছে, ভাড়া না বাড়ালে ফ্লাইট চালানো সম্ভব নয়।’ আরেকজন জানান, ‘এই পরিস্থিতি সাময়িক হলেও দ্রুত সমাধান না হলে ফ্লাইট কমানো বা বন্ধ করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।’
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে কয়েক সপ্তাহে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে প্রায় ৯০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করতে পারেননি এবং সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে ৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে যাত্রীরা শুধু আটকে পড়ছেন না, বিকল্প রুটে চাপ বাড়ায় অন্যান্য এয়ারলাইনসেও আসন সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে যেসব ফ্লাইট চালু আছে, সেগুলোর ভাড়া আরও বেড়ে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকাগামী রুটে এই চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি। জেট ফুয়েলের ওপর ট্যাক্স ও ভ্যাট কমানো, এয়ারলাইনসকে ভর্তুকি দেওয়া এবং ডলার সংকট মোকাবিলায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, ‘ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে না আনলে যাত্রী ও এয়ারলাইনস উভয়ই বড় সংকটে পড়বে।’
সরকারি পর্যায়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আকাশপথে ভ্রমণ আপাতত অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।