
দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং করের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে এবার ব্যাংকিং খাতের ওপর কড়া নজরদারি বসাতে যাচ্ছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে শুধু নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেই নয়, বরং বর্তমানে চালু থাকা পুরনো ব্যাংক হিসাবগুলো সচল রাখতেও করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) থাকা পুরোপুরি বাধ্যতামূলক করার একটি বড় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এই কঠোর নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও সাধারণ শিক্ষার্থী, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা বিভিন্ন ভাতাভোগী এবং রাষ্ট্রীয় গেজেটের মাধ্যমে কর থেকে অব্যাহতি পাওয়া বিশেষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে মওকুফ বা ছাড় দেওয়া হতে পারে।
আসন্ন বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ সংক্রান্ত প্রস্তাব দিতে পারেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি বড় অংশের গ্রাহকের কোনো টিআইএন নেই। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, টিআইএন জমা না দিলে ব্যাংক আমানতের লভ্যাংশ বা সুদের ওপর বেশি হারে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়, তবে হিসাব পরিচালনা করার ক্ষেত্রে টিআইএন থাকা এতদিন বাধ্যতামূলক ছিল না।
আর্থিক খাতের কর্তাব্যক্তিদের মতে, সব ধরনের ব্যাংক হিসাবে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে গ্রাহক সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে। তবে কর আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের অভিমত, ব্যাংক হিসাব খোলা ও তা সচল রাখার ক্ষেত্রে টিআইএন যুক্ত করা হলে দেশের সব বড় বড় আর্থিক লেনদেনের ওপর সরকারের নজরদারি জোরদার হবে, যা কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
কর ফাঁকি রোধের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এনবিআর সরাসরি ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে নিজেদের সিস্টেম অনলাইনভিত্তিক সংযুক্ত বা ইন্টিগ্রেটেড করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। শুধু ব্যাংকিং খাতই নয়, এর পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবা দাতা প্রতিষ্ঠান এবং জমির সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ডেটাবেজের সঙ্গেও এনবিআরের অনলাইন সংযোগ স্থাপনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্বের পরিধি বাড়াতে এনবিআর আরও কিছু নতুন ও কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—১৫০ সিসি বা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সময়ে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, উৎসে কর কর্তনকারী সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘উইথহোল্ডার্স রেজিস্ট্রেশন নম্বর (উইন)’ চালু করা এবং প্রান্তিক বা খুচরা ব্যবসায়ীদের আয়ের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ কর আরোপ করা।
এই নতুন উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, "এর আগে ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর ক্রেডিট কার্ড গ্রহণের হার কমে গিয়েছিল। নতুন করে ব্যাংক হিসাবধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যাংক লেনদেনও কমে যেতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "এমনিতেই মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে এক ধরনের ভীতি রয়েছে। কোনো কিছু বাধ্যতামূলক করার আগে এনবিআরের উচিত সেই ভীতির বিষয়টি সমাধান করা।"
কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব সচল রয়েছে। তবে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক হিসাব থাকার কারণে দেশে প্রকৃত ব্যাংক হিসাবধারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কত, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, নগদ লেনদেননির্ভর একটি অর্থনীতিতে ইলেকট্রনিক টিআইএন (ই-টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার মতো কঠোর পদক্ষেপ দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের বাধা উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিতে পারে, নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি ও তারল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, "কঠোর বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে সরকারের উচিত প্রথমে একটি নগদবিহীন লেনদেনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া, কর রিটার্নে ডিজিটালভাবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে কর ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটানো।"
তিনি আরও বলেন, "জাতীয় সম্পদসংক্রান্ত তথ্যভান্ডারকে কর রিটার্নের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করা গেলে কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতার পরিধি বাড়ানো সহজ হবে।"