
ইসরাইলের সামরিক ও রাজনৈতিক মহল রবিবার রাতে চালানো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই ঘটনাটিকে অনেকেই তেল আবিবের জন্য একটি বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান যে সরাসরি ইসরাইলের ভূখণ্ডে এত বড় মাত্রার আঘাত হানবে, তা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি।
সমীকরণে বড় ভুল
ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় ‘চ্যানেল ১৩ নিউজ’-এর জ্যেষ্ঠ সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড এক মূল্যায়নে লিখেছেন, ইসরাইল ও তার মিত্রদের ধারণা ছিল ইরান হয়তো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে ভয় পাবে। কিন্তু রবিবারের হামলা প্রমাণ করেছে যে ইসরাইলের এই কৌশলগত অনুমান সম্পূর্ণ ভুল ছিল।
বেন ডেভিড উল্লেখ করেন, "আমরা ভেবেছিলাম আমাদের কঠোর অবস্থান তেহরানকে স্তব্ধ করে রাখবে। কিন্তু তারা দেখাল যে তারা ঝুঁকি নিতে এবং সমীকরণ বদলে দিতে প্রস্তুত।"
বাস্তবে, এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল গত রবিবার দিনের শুরুতে, যখন ইসরাইলি বিমানবাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে একটি বহুতল ভবনে বিমান হামলা চালায়। ইসরাইল একে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বলে দাবি করলেও, ইরান একে লেবাননের চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম ও স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে।
বেন ডেভিডের মতে, বৈরুতে ইসরাইলের ওই হামলাটি ছিল মূলত ‘প্রতীকী’, যাতে দুজন লেবানিজ নাগরিক প্রাণ হারান। কিন্তু তার জবাবে মধ্যরাতে ইরানের পক্ষ থেকে যে পাল্টা আঘাত আসে, তা ছিল ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, সুসংগঠিত এবং বিধ্বংসী।
ট্রাম্পের চাপ ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ
ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলোতে এখন শুধু ইরানের হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়েই আলোচনা হচ্ছে না, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার ওপরও তীব্র আলো ফেলা হচ্ছে। হামলার পরপরই ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা না চালানোর জন্য কঠোরভাবে অনুরোধ করেছেন।
ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পের এই অনুরোধ বা চাপ মেনে নেওয়ার কারণে নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। অনেক বিশ্লেষক প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে বলছেন যে, ইসরাইল তার সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণভাবে একজন বিদেশি নেতার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিচ্ছে, যা ইসরাইলের সামরিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।
নেতানিয়াহুর সমালোচকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করা ইসরাইলের জন্য একটি বড় ধরনের "কৌশলগত বিপর্যয়" (Strategic Setback)। এর ফলে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইসরাইলের যে দাপট ও প্রতিরোধ ক্ষমতা (Deterrence) ছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঙ্কারে হাসপাতাল ও যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি
ইরানের এই নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলার পর ইসরাইলজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তেল আবিব, জেরুজালেমসহ দেশটির প্রধান প্রধান শহর ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর আকাশে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে থাকে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং ইরানের পরবর্তী সম্ভাব্য হামলার কথা বিবেচনা করে ইসরাইলি প্রশাসন ও চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ তাত্ক্ষণিক জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোর নবজাতক নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (NICU), আইসিইউ এবং জটিল অস্ত্রোপচার কক্ষের মতো অতি-সংবেদনশীল চিকিৎসা সরঞ্জামাদি দ্রুত মাটির নিচে অবস্থিত সুরক্ষিত বোমা নিরোধক বাঙ্কারে (Underground Bunkers) স্থানান্তর করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, মিডল ইস্ট আই-এর এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরানের এই আকস্মিক ও সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এটি একদিকে যেমন ইসরাইলের গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাকে উন্মুক্ত করেছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ওপর তেল আবিবের অতি-নির্ভরশীলতাকে পুনরায় সামনে এনেছে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই