
ভয়াবহ এক ভূকম্পনের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপের বিস্তীর্ণ উপকূল। আজ সোমবার (৮ জুন) সকালে আঘাত হানা রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার এই অতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে উপদ্বীপে প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয় নেমে এসেছে। ভয়াবহ এই কম্পনের পরপরই প্রাথমিকভাবে ১৫ জনের প্রাণহানির খবর মিললেও, সময় গড়ানোর সাথে সাথে ধসে পড়া ভবন ও মাটিচাপাদের উদ্ধার করতে গিয়ে লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা দ্রুত লাফিয়ে বর্তমানে ৩২ জনে গিয়ে ঠেকেছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে এই শক্তিশালী ভূকম্পনটি অনুভূত হয়। এরপরই ফিলিপাইন ছাড়াও প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় জরুরি সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়, যার বেশ কিছু অবশ্য কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক এই তাণ্ডবে বিভিন্ন প্রদেশে শতাধিক মানুষ গুরুতর জখম হয়েছেন এবং অন্তত ২৪ জন বাসিন্দা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পের তীব্রতায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ও বহুতল ভবন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় ফাস্টফুড চেইন ‘জলিবি’-র একটি রেস্তোরাঁ ভেঙে সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ২৬ মিলিয়ন মানুষের বাসস্থান ও ফিলিপাইনের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ মিন্দানাওয়ের বিভিন্ন পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক ভূমিধসের ঘটনাও নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রস্থল থেকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী উপকূলীয় সারঙ্গানি প্রদেশে সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কেবল এই প্রদেশেই ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের সিংহভাগই মাটির নিচে চাপা পড়েছিলেন। ঘটনার পর পরই সারঙ্গানিতে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়লেও, পরবর্তীতে তা মেরামত করে সচল করা সম্ভব হয়।
এদিকে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর এবং বিশ্বখ্যাত বক্সার ম্যানি প্যাকিয়াওয়ের হোমটাউন হিসেবে পরিচিত জেনারেল সান্তোসে সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে ১০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সেখানে এখনও ২২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এর বাইরে দক্ষিণ কোটাবাতো এবং সুলতান কুদারাত প্রদেশও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফিলিপাইনের নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই এই আকস্মিক দুর্যোগ হানা দেওয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের সমস্ত স্কুল-কলেজে পাঠদান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দাভাও ওরিয়েন্টাল প্রদেশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তীব্র কম্পনের জেরে আতঙ্কিত খুদে শিক্ষার্থীরা মাঠের মাঝে গুটিসুটি মেরে বসে আছে এবং তাদের ঠিক পেছনেই একটি শেড ভেঙে পড়ছে, তবে সৌভাগ্যবশত সেখানে কোনো শিশু হতাহত হয়নি। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট মার্কোস জানিয়েছেন, সরকারের সমস্ত সংস্থা সমন্বিতভাবে উদ্ধারকাজে নেমেছে এবং মিন্দানাওয়ের পাশে পুরো দেশ রয়েছে।
মূল ভূকম্পনের পর এলাকাটিতে ১.৩ থেকে শুরু করে ৬.৭ মাত্রার অন্তত ১৩০টিরও বেশি আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। ফিলিপাইন ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সক্রিয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই এমন মাঝারি ও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
এদিকে এই ভূমিকম্পের প্রভাবে জাপানের ওকিনাওয়া ও ওগাসাওয়ারা দ্বীপে হালকা সুনামি জোয়ারের দেখা মিলেছে এবং ইন্দোনেশিয়া, পালাউ ও ফিলিপাইনের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে কয়েক সেন্টিমিটার থেকে শুরু করে ১.৪ মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়েছে।
ফিলিপাইনের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে আসা এই হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক সংখ্যাগুলো সরকারিভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
সূত্র: বিবিসি।