
খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি বাড়ানো এবং আদালতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ঋণসংক্রান্ত মামলার চাপ কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজল্যুশন-এডিআর) ব্যবস্থায় নতুন নীতিমালা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির বিষয়ে ‘মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এডিআর ব্যবস্থায় যোগ্য ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতের ওপর থাকা চাপও কমবে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ঋণসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে এডিআর কার্যকর একটি পদ্ধতি হতে পারে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ১১/২০২৪ এবং বিআরপিডি-২ সার্কুলার লেটার নম্বর ০২/২০২৬ জারি করে এডিআরের মাধ্যমে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে আর্থিক খাতে মধ্যস্থতা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে যোগ্যতা, সক্ষমতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রয়োজন ছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেই কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, এডিআর কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, পার্টনারশিপ অ্যাক্ট অথবা কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন থাকতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের পেশাগত বা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে।
প্রতিষ্ঠান কিংবা এর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য দেউলিয়া, ঋণখেলাপি বা দুর্নীতিসহ গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হয়ে থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির যোগ্য হবে না।
প্রতিটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে পাঁচ সদস্যের একটি মধ্যস্থতাকারী প্যানেল থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই প্যানেলে অন্তত একজন হিসাববিদ এবং একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে।
মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা অথবা বিচারিক কার্যক্রমে ন্যূনতম ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি কোনো মধ্যস্থতাকারী ঋণখেলাপি বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি) হতে পারবেন না।
তালিকাভুক্তির আবেদন করা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট কার্যালয়ের পাশাপাশি আলাদা মধ্যস্থতা কক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অনলাইন শুনানির সুবিধা, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তথ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া স্বার্থের সংঘাত মোকাবিলা, গোপনীয়তা রক্ষা, আচরণবিধি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাইয়ে ১০০ নম্বরের স্কোরিং ম্যাট্রিক্স ব্যবহার করা হবে। তালিকাভুক্ত হতে হলে প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে ৭০ নম্বর পেতে হবে।
প্রাথমিকভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির মেয়াদ থাকবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ক্যালেন্ডার বছর শেষ হওয়ার পর দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করতে পারবে। গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান কিংবা নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও বাংলাদেশ ব্যাংকের থাকবে।