
নীতিমালা অমান্য করে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য দেওয়া অতিরিক্ত দুই উৎসাহ বোনাসের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা এখনো ফেরত নেওয়া সম্ভব হয়নি। বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ওই বছর ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোট পাঁচটি বোনাস দেওয়া হয়।
বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তবে সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বরও একই বিষয়ে ব্যাংকটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে নীতিমালার বাইরে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোনালী ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকটির প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী বোনাস পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য তিনটি উৎসাহ বোনাসের সঙ্গে তাদের আরও দুটি অতিরিক্ত বোনাস দেওয়া হয়।
প্রতিটি বোনাসের অর্থ সাধারণত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার হিসাব অনুযায়ী, একটি বোনাস বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে অতিরিক্ত দুই বোনাসের মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
পাঁচটি বোনাসের দাবিতে কর্মকর্তাদের আন্দোলন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর, ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করেন একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তাদের দাবি ছিল, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনায় তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার অনুমতি ছিল না।
বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলার মধ্যেই ২০ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এর আগে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপের মুখে নীতিমালার বাইরে গিয়ে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করেছিল। পরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তিও ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও পাঁচটি বোনাস দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।
অনুমোদন না দিলেও ফেরত নেওয়া যায়নি অর্থ
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ওই চিঠিতে অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে নির্দেশ দেওয়ার দেড় বছর পরও ওই অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের নীতিমালা কিংবা ২০২৫ সালের নীতিমালা—কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক সেটি অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে। একই সঙ্গে নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করে ব্যাংকটি। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি।
১১ সেপ্টেম্বর আবারও অর্থ ফেরতের নির্দেশ
গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো চিঠিতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের বিপরীতে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি পুনর্ব্যক্ত করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
চিঠিতে একই সঙ্গে নীতিমালার বাইরে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদনেও পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো চিঠিতে জানায়, ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও উল্লেখ করে, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব বোনাস নীতিতেও তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিধান নেই।
এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির ৮৭০তম পর্ষদ বৈঠকে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
ওই অনুমোদনের সময় শর্ত দেওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি উঠলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা নেওয়ার শর্তও রাখা হয়।
উৎসাহ বোনাসে নতুন নির্দেশিকা
সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঢালাওভাবে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
নতুন নির্দেশনায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়।
সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংকসহ ছয়টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মীদের বোনাস দেওয়ার আগে পাঁচটি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। সূচকগুলো হলো—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
নতুন নির্দেশনায় মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে কতটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত মূল্যায়নে নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমে যাবে। আর নির্ধারিত মানের নিচে নম্বর থাকলে কোনো উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে না।