
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে মোট ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অনমনীয় বা কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।
বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোনের (এসসিএনসিএল) সভায় এসব ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানিয়েছে, অনুমোদিত ঋণের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের নতুন একটি প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং জরুরি জ্বালানি আমদানির জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার নেওয়া হবে।
এডিবির দেওয়া ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এ।
ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, এ ঋণের সুদের হার সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ স্প্রেড যোগ করে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে পাঁচ বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড। পাশাপাশি শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ প্রযোজ্য হবে।
এডিবির খসড়া ঋণচুক্তির শর্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ ঋণের গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। গ্রান্ট এলিমেন্ট ২৫ শতাংশের নিচে হওয়ায় ঋণটিকে অনমনীয় ঋণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
১৩ সমিতির বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে উন্নয়ন
ঢাকা শহরের আশপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হবে। ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর ব্যবহারের পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটরিং ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তিও যুক্ত করা হবে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা ও বিদ্যুতের মান উন্নত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে ৩.১ বিলিয়ন ডলার
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক আইটিএফসি থেকে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণ নেওয়ার প্রস্তাবও এসসিএনসিএল ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে।
এই ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য দেওয়া হবে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করা হবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ঋণটির মেয়াদ ছয় মাস। সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ যোগ করে। গত বছরের বার্ষিক হারের তুলনায় এবার এই হার কিছুটা কম।
মোট ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সুবিধার মধ্যে আইটিএফসি তার নিজস্ব উৎস থেকে দেবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার। অবশিষ্ট ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানি করে দেশের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার প্রয়োজন থেকেই এই ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অনমনীয় বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নির্দেশনাও সভায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে ইআরডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণের ডেবট সার্ভিসিং ব্যয় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ অথবা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
এ ছাড়া দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বা ডেবট স্টক জিডিপির ১০ শতাংশের মধ্যে রাখার শর্ত রয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।