
তারল্য সংকটে থাকা বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এ ঋণের বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টিতে দেওয়া এ অর্থ দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান ঋণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “টাকার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি আছে। এই অর্থ ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক তারল্যের চাহিদা মেটানো এবং ব্যাংক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীরা যাতে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে ন্যাশনাল ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিতে সোনালী ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ধার নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো টাকা ধার দেয়নি। কিন্তু কোনো ব্যাংক যদি সমস্যায় পড়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা চায় তাহলে তো আমরা তাকে ফেলে দেব না। চাহিদা মত ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ যেন তুলতে পারে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে।
“এখন ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ সংগ্রহ করবে। কোথা থেকে করবে সেটা তারা (ন্যাশনাল ব্যাংক) ঠিক করবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা থাকতে পারে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সোনালী ব্যাংকের দেওয়া অর্থের বিপরীতে তিন মাসের গ্যারান্টি রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ সময়ের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে। গভর্নরের নির্দেশনায় দুই ব্যাংকের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই গ্যারান্টির আওতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সোনালী ব্যাংককে অর্থ ফেরত দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের অর্থ ধার নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঋণ অনিয়ম ও অনাদায়ী খেলাপি ঋণের চাপে কয়েক বছর ধরে লোকসান করছে ব্যাংকটি। তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় ব্যাংকটিতে আমানত সংগ্রহও কমে গেছে। এতে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গত ৮ অক্টোবর ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন।
ওই বৈঠকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীরা যাতে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারেন, সে জন্য ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর।
সারা দেশে ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮৫টি শাখা রয়েছে। গভর্নরের এ নির্দেশনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর গত সোমবার পর্যন্ত ব্যাংকটিতে আমানত তোলার জন্য সাড়ে চার হাজার আবেদন জমা পড়ে।
ব্যাংকটির সর্বশেষ অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ১০ পয়সা। ২০২৫ সালের একই সময়ে ব্যাংকটির মোট লোকসান ছিল ৯৮৫ কোটি টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। তখন ব্যাংকটির পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের হাতে।
এরপর ব্যাংকটির পুরোনো উদ্যোক্তা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ২১ বছর পর ২০২৪ সালের আগস্টে চেয়ারম্যান হিসেবে ফিরে আসেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে শুরু থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও ছিলেন মিন্টু।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়াল উত্তরাধিকারসূত্রে ব্যাংকটির পরিচালক হন এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।