
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা। দিন দিন এই প্রতিবাদ আরও তীব্র রূপ ধারণ করায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ও লাঠিপেটার ঘটনায় গর্জে উঠেছেন বিনোদন জগতের বিশিষ্ট তারকারা। প্রখ্যাত অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ্, সংগীত তারকা অরিজিৎ সিং ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কণ্ঠশিল্পী দিলজিৎ দোসাঞ্জসহ বাংলাদেশ ও ভারতের একাধিক চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এখন সরাসরি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা তারকাদের তালিকায় রয়েছেন— শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ, নাসিরুদ্দিন শাহ্, সোনাক্ষী সিনহা, হুমা কুরেশি, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, অরিজিৎ সিং, রিতেশ দেশমুখ, জেনেলিয়া ডিসুজা, স্বরা ভাস্বর এবং পুনম পান্ডে প্রমুখ।
আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ্। ক্ষোভ প্রকাশ করে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন:
"যদি একজন অজ্ঞ ব্যক্তি এই দেশের নেতৃত্ব দেয়, তাহলে সে চাইবে পুরো দেশও তার মতো অজ্ঞ, অবিবেচক, অযোগ্য ও নির্মম হয়ে উঠুক। এই মুহূর্তে আমি খুব মর্মাহত। আমাদের সন্তানদের যেভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে, তা দেখে আমি রাগে ফুঁসছি। এসব গুন্ডাদের দেখে আমার যুক্তরাষ্ট্রের আইসিই এজেন্টদের কথা মনে পড়ে। যাদের মুখে মুখোশ, হাতে লাঠি। এটাও মনে রাখুন, একদিন আপনাদেরও নিজেদের কাজের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।"
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ঝেরেছেন খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং। তিনি লেখেন:
"আপনারা তো এখন শিক্ষার্থীদেরও মারধর করছেন! নিজেদের কি ভগবান ভেবে নিয়েছেন? সবকিছু মনে রাখা হবে। মনে রাখবেন, পরিবর্তনই একমাত্র সত্য।"
একই সুরে কথা বলেছেন জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন:
"যা হয়েছে, তা একেবারেই ঠিক হয়নি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি, তাদের কথা শুনুন। মানুষের কণ্ঠই আসলে ঈশ্বরের কণ্ঠ।"
শিক্ষার্থীদের ওপর এই নির্যাতন দেখে গভীর মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী হুমা কুরেশি। তিনি জানান, পুলিশের এই তাণ্ডবের দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে এবং এটি তিনি কখনো ভুলবেন না। অন্যদিকে, অভিনেত্রী পুনম পান্ডে আন্দোলনের সমর্থনে জানান, এটি কোনো দলীয় বা ধর্মীয় লড়াই নয়; বরং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষার যুদ্ধ।
শুরু থেকেই রাজপথে আন্দোলনকারীদের পাশে দেখা গেছে অভিনেতা প্রকাশ রাজকে। এই দমন-পীড়নকে একনায়কতন্ত্রের বর্বর রূপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি নিজে যন্তর মন্তরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অভিনেত্রী শাবানা আজমিও যন্তর মন্তরে উপস্থিত হয়ে অনশনরত ও অসুস্থ শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিকে, সীমান্তের বাধা পেরিয়ে ভারতের এই শিক্ষার্থী আন্দোলনের পক্ষে সুর তুলেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় গানওয়ালি ও প্রতিবাদী শিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান। দীর্ঘ অনশনরত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের লড়াইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গত মঙ্গলবার একটি নতুন গান প্রকাশ করেছেন তিনি। গানে গানে সায়ান সুর তোলেন:
"তুমি অধিকার যদি বোঝ/ তবে সোনম ওয়াংচুককে চেনা দরকারি/ তার গল্প কী করে না বলে পারি?"
গানের পরবর্তী লাইনে এই প্রতিবাদের সঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে সায়ান গাইতে থাকেন:
"যারা রাস্তায় খায় মার/ আমি থাকব তাদেরই দলে/ মরে যাওয়া ভালো/ তবু লুকাব না গদির ছায়ার তলে/ আমি শাসকের সাথে দোস্তি পাতিয়ে/ প্রেমের-প্রাণের করি না ক্ষতি/ আমি সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে জানাবই সংহতি।"
উল্লেখ্য, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে গত ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। যন্তর মন্তরে ২১ দিন ধরে টানা অনশন পালনের পর গত শনিবার দিল্লি পুলিশ তাঁকে জোরপূর্বক সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করায়। তবে হাসাপাতালের বেডে শুয়েও সোনম ওয়াংচুক তাঁর অনশন কর্মসূচি অবিচলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।