
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মামলাসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কৌশলে গোপন করেছেন ডন।
তবে মামলার ঘটনার আগে, ঘটনার সময় এবং পরে ডনের আচার-আচরণ ও চলাফেরা বিশ্লেষণ করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে আদালতকে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এই আদেশ দেন। আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রিমান্ড শেষে কারাগারে ডন
পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
আদালতে দেওয়া আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন তাদের চেনেন বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু মামলার গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য তিনি কৌশলে গোপন করছেন।
তদন্ত আবেদনে বলা হয়, সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার সঙ্গে চলাফেরা করার কারণে ডন অভিনেতার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
আচরণ ও চলাফেরায় মিলছে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ
সালমান শাহর মৃত্যু এবং মামলার ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন অত্যন্ত কৌশলীভাবে উত্তর দিয়েছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলার ঘটনার আগে, ঘটনার সময় এবং পরবর্তী সময়ে তার আচরণ ও চালচলন বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে তার জড়িত থাকার বিষয়ে অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেছে সিআইডি।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
প্রয়োজনে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে আরও বলা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডনকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন হতে পারে।
এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার
এর আগে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর গত ২০ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পর ২৭ আগস্ট আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পাঁচ দিনের সেই রিমান্ড শেষে বুধবার তাকে আবার আদালতে হাজির করা হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তিন দশকেও মীমাংসা হয়নি সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান সালমান শাহ। তার মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল—এই প্রশ্নের মীমাংসা গত তিন দশকেও হয়নি।
অভিনেতার মৃত্যুর ২৯ বছর পর গত বছর আদালত এ ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।
মামলায় আসামি ১১ জন
সালমান শাহ হত্যা মামলায় তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর করা এই হত্যা মামলায় এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে ডনের জিজ্ঞাসাবাদ ও তার ভূমিকা যাচাইয়ের বিষয়টি। সিআইডির দাবি, তার আগের ও পরের আচরণ এবং মামলার সময়কার চলাফেরায় এমন কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, যা তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে।