
দেশের তরুণ ও অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১,৮৯১ জন নতুন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ২১৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংক্রমণের হার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, ইনজেক্টেবল ড্রাগ ব্যবহার, কনডমসহ নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহার না করা এবং যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব—এই সব কারণ তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ানোর জন্য প্রধান ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে সীমিত আলোচনা তরুণদের মধ্যে কৌতূহল ও ভুল ধারণাকে ত্বরান্বিত করছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক তরুণ জানান, “অন্যের ব্যবহৃত সুচ এমন ঝুঁকি সৃষ্টি করে তা আমি জানতাম না; জানলে কখনোই করতাম না।” আরেক তরুণের মন্তব্য, “আমাদের নিয়ে সমাজে শুধুই নৈতিকতার আলোচনা হয়, নিরাপত্তার কথায় খুব কমই ফোকাস দেওয়া হয়।”
ইউএনএইডস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, “তরুণদের মধ্যে অসচেতনতা ও রোমাঞ্চের চাহিদা বহু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিচালিত করছে।” তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ যৌন আচরণের শিক্ষাই সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, “নিয়মিত ওষুধ নিলে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে যায়।” তিনি আরও বলেন, “অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও পরীক্ষা করাতে দেরি করেন। সামাজিক লজ্জা ও ভয় তাদের চিকিৎসা শুরু করতে বাধা দেয়।”
রাজধানীর বাড্ডার এক রোগী জানান, “আমি এখন নিয়মিত ওষুধ নিচ্ছি, কিন্তু আমার মতো ভুল আর কেউ যেন না করে।”
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সতর্ক করেন, “স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা কতটা কার্যকর হচ্ছে তা মূল্যায়ন করা জরুরি। সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ চললেও সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন কার্যক্রম সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে তা নিশ্চিত করতে হবে।”
সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে তরুণদের মধ্যে যৌনতার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, কিন্তু যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও সঠিক ধারণার অভাব রয়েছে।
মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রযুক্তির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো তরুণদের কাছে বাধাহীনভাবে পৌঁছছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।”
বিশেষজ্ঞরা সামাজিক লজ্জা ভাঙা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার এবং তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।