
বিশ্বজুড়ে যখন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে নতুন নতুন শঙ্কা দানা বাঁধছে, ঠিক তখনই প্রাণঘাতী ‘হান্টাভাইরাস’ এক নতুন উদ্বেগের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে অন্তত তিনজনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ভাইরাসটি সীমিত পরিসরে ছড়ালেও এর উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
কোভিড নয়, ভিন্নধর্মী সংক্রমণ
শুক্রবার (৮ মে) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহামারি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ডা. মারিয়া ভ্যান কেরখোভ জানিয়েছেন, এটি কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়। তিনি বলেন, "এটি কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়। ভাইরাসটি ভিন্নভাবে ছড়ায় এবং এখন পর্যন্ত এর বিস্তার সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।"
সংস্থাটির জরুরি স্বাস্থ্য কর্মসূচির অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স কোঅর্ডিনেশন বিভাগের পরিচালক ডা. আবদিরাহমান মাহমুদ ২০১৮-১৯ সালে আর্জেন্টিনার পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, "২০১৮-১৯ সালে আর্জেন্টিনায় একই ধরনের পরিস্থিতি হয়েছিল। এ সময়ে একজন উপসর্গযুক্ত ব্যক্তি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর বহু মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল। এখন আমরা একই ধরনের পরিস্থিতিতে আছি। একটি আবদ্ধ জায়গায় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা একটি ক্লাস্টার তৈরি হয়েছে। যদি আমরা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং আইসোলেশন ঠিকভাবে অনুসরণ করি, তাহলে এই সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া সম্ভব। এটি বড় কোনো মহামারি হওয়ার আশঙ্কা নেই।"
ইঁদুর থেকে ছড়ায় এই মরণব্যাধি
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইঁদুরের লালা, বিষ্ঠা ও প্রস্রাব থেকে এই ভাইরাস বাতাসে মিশে যায়। বিশেষ করে ইঁদুর রয়েছে এমন নোংরা জায়গা পরিষ্কার করার সময় নিশ্বাসের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। সত্তরের দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর তীরে প্রথম শনাক্ত হওয়ায় এর নাম রাখা হয় হান্টাভাইরাস।
ভয়ংকর মৃত্যুহার ও উপসর্গ
চিকিৎসা সাময়িকী 'দ্য ল্যানসেট' ও সিডিসির তথ্যমতে, এই ভাইরাস প্রধানত ফুসফুস ও কিডনিকে অকেজো করে দেয়। এর মধ্যে ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস) সবচেয়ে প্রাণঘাতী, যেখানে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
লক্ষণ: ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। শুরুতে সাধারণ ফ্লুর মতো ক্লান্তি ও জ্বর হয়। এর ৪ থেকে ১০ দিন পর কাশি, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসে পানি জমার মতো জটিলতা তৈরি হয়।
শনাক্তকরণ: সংক্রমণের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য যে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে নিউ মেক্সিকোতে অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী ও পিয়ানোবাদক বেটসি আরাকাওয়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
নেই কোনো প্রতিষেধক
বর্তমানে হান্টাভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা সরাসরি ওষুধ নেই। রোগীদের সাধারণত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে শরীরের তরল পদার্থের ভারসাম্য ঠিক রাখা হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রয়োজন পড়ে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।