
ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হারিয়ে যাওয়া ছয়টি পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নিখোঁজ এসব অস্ত্র ভুল হাতে পড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক দশকে অন্তত ছয়টি এমন ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে দুর্ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র হারিয়ে গেছে এবং এখনো সেগুলোর কোনো সন্ধান মেলেনি। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে কেউ খুঁজে পেলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মার্কিন সামরিক পরিভাষায় এ ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনাকে বলা হয় ‘ব্রোকেন অ্যারো’। অর্থাৎ এমন ঘটনা, যেখানে দুর্ঘটনার কারণে পারমাণবিক অস্ত্র হারিয়ে যায় বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা যদি এসব নিখোঁজ বোমা খুঁজে না পায়, তাহলে প্রতিপক্ষের পক্ষেও সেগুলো খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
মার্কিন নথি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩২টি ‘ব্রোকেন অ্যারো’ ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের কোনো হদিস এখনো মেলেনি।
এ ধরনের সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা ঘটে ১৯৫৮ সালে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের টাইবি দ্বীপের কাছে আকাশে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষ হয়। তখন একটি বি-৪৭ স্ট্রাটোজেট বোমারু বিমান সম্পূর্ণ সশস্ত্র একটি মার্ক-১৫ হাইড্রোজেন বোমা বহন করছিল। সংঘর্ষের পর বিমানটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাইলট আশঙ্কা করেন, বোমাটি বিস্ফোরিত হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়ে জর্জিয়ার উপকূলের কাছে ওয়াসাউ সাউন্ড এলাকার পানিতে বোমাটি ফেলে দেন।
প্রায় ৭ হাজার ৬০০ পাউন্ড ওজনের এই মার্ক-১৫ হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৮ মেগাটন। তুলনামূলকভাবে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকিতে নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’–এর চেয়ে প্রায় ১৯০ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল।
দুর্ঘটনার পর বহুবার অনুসন্ধান চালানো হলেও ওই পারমাণবিক বোমাটি আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। ফলে এটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের হারিয়ে যাওয়া পারমাণবিক অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তখন মার্কিন বিমানবাহিনী জনসাধারণকে জানিয়েছিল, বোমার প্লুটোনিয়াম ওয়ারহেডটি উড্ডয়নের আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং তার পরিবর্তে সিসা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কয়েক দশক পর, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ১৯৬৬ সালের কংগ্রেসনাল সাক্ষ্যে উল্লেখ ছিল— টাইবি মার্ক-১৫ আসলে একটি অক্ষত পারমাণবিক অস্ত্র ছিল।
এছাড়া ১৯৬৬ সালে দুটি মার্কিন সামরিক বিমানের সংঘর্ষের পর ভূমধ্যসাগরে একটি বি-২৬ থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা হারিয়ে যায়, যার ওয়ারহেড এখনো নিখোঁজ বলে জানা গেছে।
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা ও পূর্ববর্তী মার্কিন-ইসরাইল অভিযানের ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাদের সক্ষমতা পুনর্গঠন করা কেবল সময়ের ব্যাপার।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেফ্রি লুইস বলেন, ‘যদি এই হামলা ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে সফল না হয়, তাহলে দেশটিতে হাজার হাজার মানুষ আবারও এই ধরনের কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রযুক্তি কয়েক দশক পুরোনো। প্রতিহিংসাপরায়ণ কোনো রাষ্ট্রের কাছে এটি আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ইরানও হয়তো উত্তর কোরিয়ার মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে— যে এই পৃথিবী বিপজ্জনক, আর তাই পারমাণবিক শক্তিধর হওয়াই নিরাপদ।’