
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ততই বড় ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে নিজেদের ভূখণ্ডকে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানালেও, তিন সপ্তাহ ধরে ইরানের অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে এখন সুর বদলাতে শুরু করেছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
রিয়াদের মনোভাব এখন ‘ইরানকে শাস্তি দেওয়ার’ পক্ষে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি সম্প্রতি সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানি হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব এখন মার্কিনিদের জন্য তাদের কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটি উন্মুক্ত করে দিতে রাজি হয়েছে।
সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত তায়েফ বিমান ঘাঁটিটি ইরানি শাহেদ ড্রোনের নাগালের বাইরে। এটি লোহিত সাগরের জেদ্দা বন্দরের কাছে অবস্থিত, যা বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় জেদ্দাকে কেন্দ্র করেই এখন হাজার হাজার মার্কিন সেনার রসদ সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের বিমান বাহিনী হয়তো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না, কিন্তু যদি মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো রণতরির বদলে সৌদি আরবের ধাহরান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন শুরু করে, তবে যুদ্ধের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
বর্তমানে সৌদি আরব ও আমিরাত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
এক পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘রিয়াদ এখন এই যুদ্ধকে ইরানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে।’ গত তিন সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে নিয়মিত ফোনালাপ হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে যে, তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আমিরাতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বলেছেন, এই যুদ্ধ অন্তত নয় মাস স্থায়ী হতে পারে বলে তারা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।
অথচ যুদ্ধের শুরুতে এই দেশগুলোই ট্রাম্পকে ইরানে হামলা না করার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের মাসুল তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাত একাই ৩৩৮টি ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং ১ হাজার ৭৪০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও তাদের রাস লাফান শোধনাগারে ইরানের হামলায় দেশটির ১৭ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি মনে করেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই অবৈধ যুদ্ধে টেনে এনেছে। তিনি বলেন, ‘এটি আমেরিকার যুদ্ধ নয়’। বিপরীতে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘সৌদি আরব বারবার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল, কিন্তু ইরান তার মর্যাদা রাখেনি। এখন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রিয়াদের আছে।’
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল বলেন, ‘সৌদি আরব ও আমিরাত শুরুতে নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে যে, প্রতিবেশী হিসেবে এমন এক কট্টরপন্থি ইরানি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তারা থাকতে পারবে না যারা মুহূর্তের নোটিশে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি অচল করে দিতে পারে।’
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে আরব দেশগুলো যেন ইসরায়েলের ওপর দিয়ে পাইপলাইন তৈরি করে। এতে কার্যত আরব দেশগুলোর জ্বালানি রফতানির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ বদর আল-সাইফ সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইসরায়েল চায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনতে।’
ইরানের হামলাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখলেও, আরব শাসকরা ইতিহাসে ‘মুসলিম প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সঙ্গী’ হিসেবে নাম লেখাতে দ্বিধাবোধ করছেন। সৌদি আরব বর্তমানে চীন-মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল, তা রক্ষা এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।