
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সামরিক বাহিনী। অভ্যুত্থানের পর হ্লাইং ঘোষণা দিয়েছিলেন, এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা বেসামরিক সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
তবে সেই এক বছর পেরোতে সময় লেগেছে পাঁচ বছর। এখন অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক ‘বেসামরিক শাসনে প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, এটি মূলত একটি ‘অভিষেক অনুষ্ঠান’, যেখানে সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক পরিচয়ে এসে নিজের ক্ষমতাকেই আরও সুসংহত করেছেন হ্লাইং।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই পার্লামেন্টে সামরিকপন্থীদেরই আধিপত্য। সংবিধান অনুযায়ী, ২৫ শতাংশ আসন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করেছে সামরিক জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে হ্লাইংয়ের আরোহন ছিল প্রায় নিশ্চিত।
ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের পরও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখছেন তিনি। তার জায়গায় সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন। পাশাপাশি একটি ‘পরামর্শক পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বেসামরিক ও সামরিক উভয় খাতে হ্লাইংয়ের প্রভাব অটুট থাকবে।
গত পাঁচ বছর মিয়ানমারের জন্য ছিল চরম অস্থিরতার সময়। গণতন্ত্রপন্থী তরুণদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ব্যাপক। ক্য উইন (ছদ্মনাম) নামে এক আন্দোলনকারী জানান, তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর, সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে অমানুষিক নির্যাতন করেছে, কিন্তু কেন করছে তা কখনোই স্পষ্ট ছিল না।’ এ সময়কালে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটে দেশটি মারাত্মক চাপে পড়েছে। ইয়াঙ্গুনের ট্যাক্সিচালক তিন উ বলেন, ‘১০ বছর আগের মিয়ানমার আর এখনকার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখন সৎভাবে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬ মিলিয়নের বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে প্রবীণ রাজনীতিবিদ মিয়া আয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সী কারাবন্দি নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর হ্লাইং চলতি বছরই তাকে মুক্তি দিতে পারেন।
তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এই নির্বাচন মানতে নারাজ। তাদের অবস্থান স্পষ্ট— সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরানো না হলে তাদের ‘বিপ্লব’ থামবে না।
সূত্র: বিবিসি