
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় বিশ্ব অর্থনীতির গতি শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে, যা গত জানুয়ারিতে নির্ধারিত ৩ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাসের তুলনায় কম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গত বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা থেকে চলতি বছর পরিস্থিতি আরও দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সংশোধিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাতপ্রবণ দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইরানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে দেশটির অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশে নামানো হয়েছে। আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গৌরিঞ্চাস এক বিবৃতিতে জানান, এই প্রবৃদ্ধি হবে অসম এবং এর ফলে নিম্ন আয়ের দেশ ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এ পথে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় তেল, গ্যাস ও সারের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বৈশ্বিক উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনায় মঙ্গলবার তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে ১ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি শক্তিশালী মার্কিন মুদ্রার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বস্টন কলেজের কৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগী ডিন আলেকজান্ডার টমিক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত স্বল্পমেয়াদেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধারা বদলে দিচ্ছে এবং এটি দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব আরও গভীর হবে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মধ্যে একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা