
নির্বাচনী লড়াই শেষ হলেও শান্তির দেখা মেলেনি পশ্চিমবঙ্গে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, নির্বিচারে ভাঙচুর আর রক্তক্ষয়ী তান্ডবে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে একাধিক এলাকা। এই সহিংসতা দমনে গিয়ে খোদ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বুধবার (৬ মে) প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী পাল্টাপাল্টি হামলা।
রণক্ষেত্র সন্দেশখালি: ওসিসহ পুলিশ আক্রান্ত
সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে উত্তর ২৪ পরগণার সন্দেশখালির ন্যাজাটে। সেখানে দুই রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলাকারীদের গুলিতে ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন করসহ আরও দুই কনস্টেবল গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পুলিশি টহল বসানো হয়েছে।
নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪, কমিশন ও প্রশাসনের উদ্বেগ
রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ভোট-পরবর্তী এই হানাহানিতে এখন পর্যন্ত অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। সহিংসতার কয়েকটি খণ্ডচিত্র:
বীরভূম: নানুর থানার সন্তোষপুর গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের বুথ সভাপতি আবির শেখকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
কলকাতা: বেলেঘাটায় নির্বাচনের দিনই তৃণমূলের এক বুথ এজেন্ট খুন হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিজেপির দাবি: দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, নিউ টাউন এবং হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে পৃথক দুটি হামলায় তাদের দুইজন সক্রিয় কর্মী নিহত হয়েছেন।
বুলডোজার বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় একটি দোকান ভাঙার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন। ভিডিওটি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, "মধ্য কলকাতায় নিউ মার্কেটের কাছে, পুলিশের অনুমতিসাপেক্ষেই, মাংসের দোকান ভাঙতে বুলডোজ়ার আনা হয়েছে। জয়ের উদ্যাপন হিসাবেই তা করা হয়েছে। সিএপিএফ কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। আপনাদের জন্য বিজেপি। সারা দুনিয়া দেখুক এই ছবি।"
তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "বিজয় মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তবে বুলডোজ়ার নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশ তা দেয়নি। আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। ভাঙচুর করার কোনও খবর নেই। বিষয়টি পুলিশ দেখছে।"
কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ভোট-পরবর্তী গোলমাল ঠেকাতে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, ফলাফল ঘোষণার পর আরও দুই মাস রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী (সিএপিএফ) অবস্থান করবে। তবে তাদের উপস্থিতিতেই একাধিক হত্যাকাণ্ড ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজ্যের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ।