
বিশ্ব রাজনীতি যখন নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই মুখোমুখি হলেন বর্তমান পৃথিবীর দুই শীর্ষ পরাশক্তি। গত বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক হাইপ্রোফাইল শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূচনাপর্বেই শি মন্তব্য করেন, ‘বিশ্ব এখন আরেকটি সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।’ এরপরই ওয়াশিংটনের দিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত থুসিডিডিসের ফাঁদ পেরিয়ে বড় দেশগুলোর সম্পর্কের নতুন ধারা তৈরি করতে পারবে?’
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেইজিংয়ের এই শীর্ষ বৈঠকটি বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কী এই ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’?
ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ (Thucydides's Trap) একটি অতি পরিচিত ধারণা। থুসিডিডিস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এবং সামরিক সেনাপ্রধান। তিনি প্রাচীন বিশ্বের দুই নগররাষ্ট্র এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে টানা তিন দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ‘পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের’ আদ্যোপান্ত লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত বিশ্লেষণে উঠে এসেছিল যে, এথেন্সের ক্রমাগত উত্থান ও ক্রমবর্ধমান শক্তি যখন স্পার্টার মনে তীব্র ভীতি ও অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে, তখনই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
প্রাচীন গ্রিসের এই ঐতিহাসিক ধারণাকে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন রূপ দেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন। ২০১২ সালে প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক নিবন্ধে তিনি প্রথম উল্লেখ করেন যে, আগামী দশকগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধানতম প্রশ্ন হবে— চীন ও আমেরিকা কি এই ঐতিহাসিক ফাঁদ এড়াতে সক্ষম হবে? পরবর্তীতে ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে অ্যালিসন যুক্তি দেখান, ওয়াশিংটন ও বেইজিং কার্যত যুদ্ধের পথেই ধাবিত হচ্ছে, যদি না উভয় পক্ষ এই উত্তেজনা প্রশমনে কোনো কঠিন ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানব ইতিহাসের গত ৫০০ বছরের এমন ১৬টি সমসাময়িক ঘটনার মধ্যে ১২টিরই চূড়ান্ত পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ যুদ্ধে।
শি জিনপিং কেন বারবার এই ফাঁদের কথা মনে করান?
আন্তর্জাতিক মঞ্চে শি জিনপিংয়ের মুখে এই ঐতিহাসিক তত্ত্বের অবতারণা এবারই প্রথম নয়। ২০১৩ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে বলে আসছিলেন, ‘আমাদের একসাথে কাজ করে এই ধ্বংসাত্মক উত্তেজনা এড়াতে হবে।’
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে শি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, দুই পরাশক্তির সংঘাত কখনোই অনিবার্য নয়। তবে এর পাশাপাশি তিনি একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন, ‘বড় দেশগুলো যদি বারবার কৌশলগত ভুল করে, তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য ফাঁদ তৈরি করবে।’
একই সুর ধরে রেখে ২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন সিনেট মেজরিটি লিডার চাক শুমারের সঙ্গে বৈঠকেও শি জিনপিং এই ফাঁদ এড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন। এমনকি ২০২৪ সালে পেরুর রাজধানী লিমায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও তিনি একই অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে বলেছিলেন, ‘নতুন কোনো স্নায়ুযুদ্ধ লড়া উচিত নয় এবং লড়া সম্ভবও নয়।’
চীনের শীর্ষ কূটনীতিকরাও সবসময় তাঁদের প্রেসিডেন্টের এই সুর ধরে রেখেছেন। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন চীনা রাষ্ট্রদূত কিন গ্যাং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, দুই দেশকে অবশ্যই “শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ খুঁজতে হবে।” অন্যদিকে ২০২৪ সালে বর্তমান রাষ্ট্রদূত শি ফেং দুই দেশের ঐতিহাসিক ভিন্নতা তুলে ধরে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘চীন এথেন্স নয়, স্পার্টাও নয়।’
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্তমান উত্তেজনা
চীনের পাশাপাশি আমেরিকার নীতিনির্ধারণী মহলেও এই ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ তত্ত্বের গভীর প্রভাব রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার ছিলেন থুসিডিডিসের লেখার একজন একনিষ্ঠ অনুরাগী। এমনকি ২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে গ্রিক ইতিহাসের এই জটিল সমীকরণ নিয়ে স্বয়ং গ্রাহাম অ্যালিসন সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং দিয়েছিলেন। এছাড়া তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসও থুসিডিডিসের যুদ্ধবিদ্যার দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন।
তবে ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার এক সুর শুনিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ট্রাম্পের জনপ্রিয় ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং বেইজিংকে সমীহ করতে বাধ্য করবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে তাইওয়ান ইস্যু—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার পারদ প্রতিনিয়ত চড়ছে। এই বৈরী আবহের মাঝেই ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শি জিনপিংয়ের এই ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করাকে অত্যন্ত অর্থবহ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক চাল হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।