
মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতির তীব্রতা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি আফ্রিকা) শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অত্যন্ত সংক্রামক ও রক্তক্ষরণজনিত এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৮৮ জন মারা গেছেন এবং আরও ৩৩৬ জনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে।
জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ডব্লিউএইচও আজ রোববার ভোরে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ইবোলার ‘বুন্ডিবুগিও’ ধরনের এই প্রাদুর্ভাব আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির আওতায় ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ডব্লিউএইচও’র সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধাপ। সংস্থাটির মতে, ভাইরাসের প্রকৃত বিস্তৃতি এবং আক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালে চালু হওয়া সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কতা তথা ‘মহামারি অবস্থা’ এখনও জারি করা হয়নি।
নেই কোনো টিকা বা চিকিৎসা: মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) এই প্রাদুর্ভাবকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে ব্যাপক পরিসরে জরুরি তৎপরতা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিআর কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল-রজার কাম্বা এই ভাইরাসের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এই ধরনের মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’
২০০৭ সালে প্রথম খোঁজ মেলা ইবোলার এই বিপজ্জনক ধরনে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও একজন কঙ্গোলিজ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে শনিবার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কেবল ‘জাইর’ নামক ইবোলার ধরনের টিকা সহজলভ্য রয়েছে; ১৯৭৬ সালে আবিষ্কৃত হওয়া সেই ধরনটির মৃত্যুহার ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত।
আক্রান্তরা মরছে বাড়িতেই, বাড়ছে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গত শুক্রবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে এই সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেন, যার সীমানা উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদান ঘেঁষা। বর্তমান মাঠপর্যায়ের শোচনীয় চিত্র তুলে ধরে স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধি আইজ্যাক নিয়াকুলিন্দা এএফপিকে ফোনে বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে মানুষকে মরতে দেখছি। আক্রান্তদের আলাদা করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা বাড়িতেই মারা যাচ্ছে, আর পরিবারের সদস্যরাই মরদেহ স্পর্শ করছেন।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা জানিয়েছেন, এই দফার প্রথম রোগী ছিলেন একজন নার্স। তিনি গত ২৪ এপ্রিল ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ইবোলাসদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সাধারণত ইবোলার প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ এবং বমি।
এমএসএফের জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট সামগ্রিক সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা, একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’
ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা: আরও ছড়ানোর আশঙ্কা
১০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ডিআর কঙ্গো আয়তনে ফ্রান্সের চেয়ে প্রায় চার গুণ বড় হলেও এর যোগাযোগ ও সড়ক অবকাঠামো অত্যন্ত ভঙ্গুর। ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত পৌঁছানো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কঙ্গোর ইতিহাসে ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ল্যাব টেস্টের প্রাথমিক নমুনায় উচ্চ সংক্রমণ হার, দুই দেশে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকা—সব মিলিয়ে বর্তমানে শনাক্ত সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এর আগে, গত বছরের আগস্টে দেশটির মধ্যাঞ্চলে ইবোলা দেখা দিলে অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়, যা ডিসেম্বরে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কঙ্গোতে হওয়া সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ইবোলা প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বাদুড় থেকে উৎপত্তি হওয়া এই ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানবদেহে তীব্র রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকল হতে পারে। ডব্লিউএইচও’র তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে এই ভাইরাসের বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল ২৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে। সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত বা শরীরের যেকোনো তরল পদার্থের সংস্পর্শে এই ভাইরাস ছড়ায়। এর সুপ্তিকাল সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে এবং শরীরে উপসর্গ প্রকাশের পরই কেবল একজন রোগী অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন।