
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কথিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বুলডোজার অভিযান, হকার উচ্ছেদ এবং ঈদুল আজহার আগে গরু বেচাকেনায় কড়াকড়ি আরোপকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তপসিয়া-তিলজালায় বুলডোজার অভিযান
দক্ষিণ কলকাতার তপসিয়া এলাকায় একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিক নিহত হওয়ার পরপরই প্রশাসন ওই অঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। মুসলিমপ্রধান এ এলাকায় বুলডোজার দিয়ে কথিত অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বাড়িঘর ও স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁদের দাবি, দমকল বিভাগের ছাড়পত্র ছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁদের কাছে ছিল।
ঘটনার পর কলকাতা হাইকোর্ট উচ্ছেদ অভিযানের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ জানায় সিপিআইএম ও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট।
হকার উচ্ছেদে সংঘর্ষ
রাজ্যের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও বাজার এলাকায়ও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। হাওড়া রেলস্টেশন, শিয়ালদহ রেলস্টেশন, আসানসোলসহ বিভিন্ন এলাকায় হকারদের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
হকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, উচ্ছেদের আগে তাঁদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়।
দিলীপ ঘোষ বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে এবং সরকারি জমি দখল কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
পার্ক সার্কাসে উত্তেজনা
মুসলিমপ্রধান পার্ক সার্কাস এলাকাতেও বুলডোজার অভিযান চালানো হয়। এর প্রতিবাদে রোববার শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের লাঠিপেটায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
গরু বেচাকেনায় কড়াকড়ি
ঈদুল আজহার আগে রাজ্যজুড়ে গরুর মাংস বিক্রি ও গবাদিপশু জবাইয়ে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের আগে স্থানীয় প্রশাসন বা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের লিখিত অনুমতি নিতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গরু বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কলকাতার বহু রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ নিষেধাজ্ঞার কারণে শুধু মুসলিম নয়, বহু হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কোরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে তাঁদের বছরের বড় অংশের আয় নির্ভর করে।
‘গরুর জন্মসনদ’ বিতর্ক
উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জে গবাদিপশুবাহী গাড়ি থামিয়ে গরুর ‘জন্মসনদ’ দেখতে চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র–এর বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় কটাক্ষ করে কুনাল ঘোষ বলেন, বিজেপিশাসিত কোনো রাজ্যের অন্তত একটি গরুর জন্মসনদ দেখানো হোক, তাহলে সেটি রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে।
নাখোদা মসজিদের ইমামের বক্তব্য
নাখোদা মসজিদ–এর ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসেমি বলেছেন, গরু বেচাকেনা ও জবাই সংক্রান্ত আইন নতুন নয়; এটি ১৯৫০ সালের আইন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে গরু কোরবানি ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, শুধু কোরবানি নয়, গরুর মাংস খাওয়াও বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ভাবা উচিত।
এদিকে অধীররঞ্জন চৌধুরী প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে বুলডোজার অভিযান, হকার উচ্ছেদ এবং কোরবানিকে ঘিরে বিধিনিষেধের কারণে পশ্চিমবঙ্গে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।