
মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর লৌহকঠিন মানসিকতার সামনে যে যেকোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য নজির সৃষ্টি করলেন রাশিয়ার সাবেক সেনাসদস্য রুস্তম নাবিইয়েভ। কোনো ধরনের কৃত্রিম পায়ের (প্রোস্থেটিকস) সাহায্য ছাড়াই, স্রেফ নিজের দুই হাতের ওপর ভর করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করে এক অনন্য ও অভূতপূর্ব ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। পর্বতারোহণের দীর্ঘ পথচলা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে দুই পা হারানো কোনো মানুষের এমন অবিশ্বাস্য উপায়ে এভারেস্ট জয় করার ঘটনা এটাই প্রথম।
নেপালের স্থানীয় সময় অনুযায়ী, গত বুধবার (২০ মে) সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে এভারেস্টের ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার উঁচুতে অবস্থিত চূড়ায় দেশের পতাকা ওড়ান রুস্তম। এই চোখধাঁধানো ও ঐতিহাসিক অভিযানের ঠিক পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভারেস্টের চূড়ায় নিজের একটি স্মরণীয় ছবি শেয়ার করেন নাবিইয়েভ। ছবিতে তাঁর ধরে থাকা একটি ফলকে খোদাই করে লেখা ছিল, ‘যারা ভেবেছিল পড়ে যাওয়ার পর জীবন শেষ। রুস্তাম নাবিয়েভ, এভারেস্ট ২০২৬।’
‘যতক্ষণ জীবন আছে, লড়ে যান’: নাবিইয়েভ
নিজের এই অবিশ্বাস্য গৌরবগাথাকে রুস্তম তাঁর কোটি অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ছবির আবেগঘন ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘নেপাল সময় অনুযায়ী ২০ মে সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে, পর্বতারোহণের ইতিহাসে এবং মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমি, রুস্তাম নাবিয়েভ, শুধু দুই হাতের সাহায্যে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছি।’
তিনি বিশ্বের তাবৎ মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাতে আরও যোগ করেন, ‘আমি এই অভিযান উৎসর্গ করছি সবাইকে, যারা আমাকে অনুসরণ করেন। আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাই যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত লড়ুন। কারণ এটা সত্যিই মূল্যবান।’
রুস্তম নাবিইয়েভের এই অভাবনীয় সাফল্যের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন এভারেস্ট বেসক্যাম্পের ফিল্ড অফিস সমন্বয়ক খিম লাল গৌতম। তিনি অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি সফলভাবে এভারেস্ট জয় করেছেন। এখন তিনি বেসক্যাম্পে ফিরে আসছেন।’
ভবন ধসে পা হারানো থেকে বিশ্বজয়ের নায়ক
রুস্তম নাবিইয়েভের এই বিজয়ী হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা কিন্তু বেশ বেদনার। ২০১৫ সালে রাশিয়ায় একটি সামরিক ব্যারাক ভবন ধসে পড়ার এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দুই পা-ই চিরতরে হারিয়ে ফেলেন তৎকালীন এই সেনাসদস্য। তবে পঙ্গুত্বের সেই চরম অন্ধকার সময়েও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি তিনি। নিজেকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে পুনর্বাসনের পথ হিসেবে বেছে নেন রোমাঞ্চকর আউটডোর অ্যাক্টিভিটি ও দুর্গম পর্বতারোহণকে।
হাতের জোরে রুস্তমের এই বিশ্বজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বইছে অভিনন্দনের জোয়ার। তাঁর শেয়ার করা ছবির নিচে একজন নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, ‘এক মুহূর্তের জন্যও সন্দেহ করিনি। অভিনন্দন!’ অপর এক ভক্ত লিখেছেন, ‘অভিনন্দন ভাই! আপনি পৃথিবীর সেরা অনুপ্রেরণাদাতা। এভাবেই উজ্জ্বল থাকুন।’ বিশ্বজুড়ে লাখো-কোটি মানুষের কাছে রুস্তাম নাবিয়েভ আজ আর কেবল একজন সাধারণ পর্বতারোহী নন, বরং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য জীবন্ত কিংবদন্তি।