
বৈশ্বিক কূটনীতির আসরে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের নিছক এক রসবোধের ভিডিও এবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ময়দানে তুমুল ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে ‘মেলোডি’ চকলেট উপহার দেওয়াকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের নিশানা বানিয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।
রাহুলের সরাসরি অভিযোগ, সাধারণ দেশবাসী যখন তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি আর জ্বালানি সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে, তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘রিল বানানো’ আর ‘টফি বিলি’ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সম্প্রতি ইতালি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে জর্জিয়া মেলোনির একটি সেলফি ও ‘মেলোডি’ টফি উপহার দেওয়ার মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হয়। ক্যামেরার সামনে দুই বিশ্বনেতার সেই হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্তটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তা ভারতের রাজনৈতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই ঘটনাটিকে মোদির ‘অনন্য রসবোধের দৃষ্টান্ত’ হিসেবে প্রচার করলেও, বিরোধী শিবির একে দেশের মূল সমস্যাগুলো থেকে জনগণের চোখ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুনিপুণ চেষ্টা হিসেবেই দেখছে।
৩-৪ হাজার কোটির বিমানে চড়ে টফি বিতরণ: রাহুল
উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলির এক বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের মন্দা নিয়ে সরকার সাধারণ জনগণকে প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে, অথচ নিজেদের বিলাসিতা ও চড়া খরচের বিদেশ সফর ঠিকই বহাল রেখেছে। কৃষক, দিনমজুর, তরুণ সমাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, তখন সরকার বাস্তব সমস্যা সমাধানের বদলে কেবল নিজস্ব ব্র্যান্ডিং ও ইমেজ তৈরিতেই সব মনোযোগ ঢালছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বৈপরীত্য তুলে ধরে জনসভায় রাহুল গান্ধী সরাসরি বলেন, ‘ইতালি যাওয়ার আগে, মেলোনির সঙ্গে দেখা করার আগে তিনি (মোদি) বলেছিলেন, অর্থনৈতিক ঝড় আসছে। কম পেট্রোল ব্যবহার করুন, স্বর্ণ কিনবেন না, বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনুন, আর বিদেশ সফর এড়িয়ে চলুন। আর ঠিক তার একদিন পরেই, তিন-চার হাজার কোটি রুপির বিমানে চড়ে নরেন্দ্র মোদি ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। পকেটে করে টফি নিয়ে গেলেন, আর সেখানে ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে টফি খাওয়ালেন।’
অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা ও আমজনতার দুর্ভোগ
সমাবেশে রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেন যে, বিগত বছরগুলোতে নেওয়া নোট বাতিলের (নোটবন্দি) ভুল সিদ্ধান্তের পর থেকেই ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড মূলত ভেঙে পড়েছে। দেশের বড় বড় পুঁজিপতি ও শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ আজ চরম আর্থিক অনটনের শিকার হচ্ছে।
দেশের বর্তমান দুরাবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘এই দেশের জনগণের সঙ্গে প্রহসন করা হচ্ছে। দেশে পেট্রোলের সংকট, গ্যাসের সংকট, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে, কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। পুরো শিল্পব্যবস্থাই ধ্বংসের মুখে।’
তবে রাজনৈতিক ময়দানে রাহুল গান্ধীর তোলা এতসব গুরুতর অভিযোগের জবাবে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।