
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই ও গবাদিপশু বিক্রি নিয়ে অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের কড়াকড়ির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একের পর এক ভিডিও, যেখানে মুসলিম যুবকদের গরু কেনাবেচা ঠেকাতে দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে বিক্রি না হওয়া পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বহু হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ী।
গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণা দেয়। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি সনদ ছাড়া গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী বা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানো পশু জবাইয়ের অনুমতি মিলবে। এছাড়া অনুমোদিত কসাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন ভাঙলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এই ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশু পরিবহন ও বিক্রি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুসলিম যুবকেরা গরু বিক্রেতাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন এবং গবাদিপশুবাহী ট্রাক থামিয়ে চালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কয়েকজন মুসলিম কনটেন্ট নির্মাতাকেও ঈদে গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, হাটে ক্রেতা না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন গরু খামারিরা। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, বছরের পর বছর ঋণ নিয়ে পশু পালন করেছেন তারা। এখন পশু বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। কয়েকজন খামারি জানিয়েছেন, দুধ দেওয়া বন্ধ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পশু পালনের খরচ বহন করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
খামারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গরু সাত থেকে আট বছর পর সাধারণত দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১৪ বছর বয়সের আগে জবাই বা বিক্রি কঠিন হয়ে পড়লে সেই পশু রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল ব্যয় গুনতে হবে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজ্যের বিভিন্ন গরুর হাটেও এবার ভিড় অনেক কম দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় সাধারণ সময়ের তুলনায় পশু সরবরাহ ও বেচাকেনা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খামারিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গবাদিপশু তাদের জন্য নগদ সঞ্চয়ের মতো কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিজেপি নেতারা বলছেন, পুরোনো আইন কার্যকর করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন দাবি করছে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই আইন কার্যকর করায় সাধারণ খামারি, পশু ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ইতোমধ্যে আইনটির কার্যকারিতা চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, হঠাৎ করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় পশু ব্যবসা, দুগ্ধ খাত, পরিবহন ও চামড়া শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু গরুর বাজার নয়, মাংস, মাছ ও বিকল্প খাদ্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও এর বড় ধরনের চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।