
তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সামরিক অস্ত্র প্যাকেজ বাতিল করার জন্য আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রবল মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে চীন। এই ভূরাজনৈতিক বিরোধের সরাসরি জের ধরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির প্রস্তাবিত বেইজিং সফর চূড়ান্ত মুহূর্তে আটকে দিয়েছে শি জিনপিং প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ব্রিটিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।
অস্ত্র চুক্তির ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত কোলবিকে ‘না’ বেইজিংয়ের
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের আন্ডার-সেক্রেটারি অব ডিফেন্স ফর পলিসি এলব্রিজ কোলবি আগামী গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বেইজিং সফরের পরিকল্পনা নিয়ে চীনা নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন। তবে চীন সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাইওয়ানের কাছে প্রস্তাবিত এই বিশাল প্রতিরক্ষা প্যাকেজ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তারা এই হাই-প্রোফাইল সফরের কোনো অনুমোদন বা ভিসা দিতে পারছে না।
অবশ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন কোনো উৎস থেকে যাচাই করতে পারেনি। সরকারি দাপ্তরিক সময় পার হয়ে যাওয়ায় পেন্টাগন এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি।
ট্রাম্পের সংশয় ও তাইওয়ানের সঙ্গে নজিরবিহীন ফোনালাপের গুঞ্জন
এদিকে, গত সপ্তাহে বেইজিং সফর সম্পন্ন করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছিলেন যে, তাইওয়ানের কাছে এই বিশাল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া আমেরিকা শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেবে কিনা, সে বিষয়ে তিনি এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ও ধোঁয়াশাপূর্ণ মন্তব্যের পর স্বশাসিত ও গণতান্ত্রিক এই দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন বজায় থাকবে কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে গত বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে আরও এক বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান যে, তিনি খুব শীঘ্রই তাইওয়ানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করবেন। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রোটোকল ভেঙে কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এটি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে একবারে যুদ্ধংদেহী করে তুলতে পারে। তবে দুই নেতার এই ফোনালাপের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে রয়টার্সকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন আইন ও তাইওয়ানের ‘সতর্ক আশাবাদ’
সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে যেকোনো ধরনের সরাসরি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সাক্ষাৎ কিংবা ফোনালাপ বেইজিংকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে। কারণ, কমিউনিস্ট চীন শুরু থেকেই তাইওয়ানকে তাদের নিজেদের মূল ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি খাটিয়ে তা দখলের হুমকি দিয়ে রেখেছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিগত ইতিহাসের অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগের শাসনামলে তাইওয়ানের কাছে রেকর্ড পরিমাণ সর্বোচ্চ অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইন অনুযায়ী, স্বশাসিত এই দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে যেকোনো বহিরাগত আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে আইনিভাবে বাধ্য রয়েছে ওয়াশিংটন।
একই সাথে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বরাবরই ‘অসাধারণ’ বলে আন্তর্জাতিক মহলে আখ্যা দিয়ে আসছেন, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আমেরিকার এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক—উভয় দলের শীর্ষ আইনপ্রণেতারাই ট্রাম্প প্রশাসনকে চীনের চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে এই অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া সচল রাখার জন্য ক্রমাগত তাগিদ দিয়ে আসছেন। এদিকে উদ্ভূত এই চরম রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে মার্কিন নীতি ও সরবরাহ নিয়ে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত অস্ত্র পাওয়ার বিষয়ে তারা এখনও ‘সতর্ক আশাবাদ’ বজায় রাখছেন।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও রয়টার্স