
ভারতে পেট্রোল ও রান্নার গ্যাসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আবারও তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। উত্তর প্রদেশের রায়বরেলিতে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন, জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সরকার প্রতিনিয়ত জ্বালানির দাম বাড়িয়েই চলেছে, যার জেরে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একই সাথে এই মঞ্চ থেকে দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি এবং বড় বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়েও একগুচ্ছ গুরুতর প্রশ্ন তোলেন তিনি।
রাশিয়ার সস্তা তেল ও রাজনৈতিক তহবিলের সংযোগ
জনসভায় রাহুল গান্ধী এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে বসেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আবহে রাশিয়া থেকে ভারত কম দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। তবে তা দেশের মানুষের স্বার্থে ব্যবহারের বদলে রিফাইন করে চড়া দামে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী। এখানেই শেষ নয়, সেই লভ্যাংশের একটি বড় অংশ ঘুরপথে রাজনৈতিক তহবিলে গিয়ে জমা হচ্ছে বলেও তোপ দাগেন এই কংগ্রেস নেতা।
বিজেপি সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে রাহুল বলেন, সরকার একসময় বুক ফুলিয়ে দাবি করেছিল দেশে গ্যাস কিংবা পেট্রোলের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ধারাবাহিকভাবে জ্বালানির দাম বাড়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ আকাশ ছুঁয়েছে। এর ফলে দেশের কৃষক, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে পড়েছে। দেশের সামগ্রিক সম্পদকে ধীরে ধীরে গুটি কয়েক বড় শিল্পগোষ্ঠীর পকেটে পুরে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি খোঁচা দেন।
রাজনৈতিক তরজা ও ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা জবাব
রাহুল গান্ধীর এই ঝাঁঝালো বক্তব্যের পর ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতারা কংগ্রেসের এই সমস্ত অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। শাসক শিবিরের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ক্রমাগত ওঠানামার কারণেই অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মূল্য সংগতিপূর্ণ করা হচ্ছে। উল্টো সরকারের বিচক্ষণ পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারত অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে বলে তারা দাবি করেন।
নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন, তুঙ্গে সরকার-বিরোধীদের সংঘাত
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে কোপ বসাচ্ছে, তা তুলে ধরে জনসভায় রাহুল গান্ধী আরও বলেন, "জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ছে। রান্নার গ্যাস, পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ সরকার জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে"
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকসভা নির্বাচন মিটে যাওয়ার পরেও কংগ্রেস হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নয়। তারা মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন খরচের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে, শাসক দল বিরোধীদের এই তৎপরতাকে স্রেফ ‘রাজনৈতিক নাটক’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দামকে কেন্দ্র করে ভারতের সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যকার রাজনৈতিক পারদ যে আরও চড়বে, সেই আভাস স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রাহুলের এই বক্তব্য নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক।