
বিশ্বজুড়ে নতুন করে ভীতি জাগানো প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রতিরোধক প্রতিষেধক বা টিকা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসতে আরও অন্তত পৌনে এক বছর বা ৯ মাস সময় লেগে যেতে পারে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদরদপ্তরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এই স্বাস্থ্য বিষয়ক অঙ্গসংগঠনের বিশেষ উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি আনুষ্ঠানিকভাবে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
তিনি জানান, ইবোলা ভাইরাসের অতি সংক্রামক ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির সংক্রমণ রুখতে বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য টিকার (ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন) উন্নয়ন কাজ চলছে। তবে প্রতিষেধক দুটি এখনো মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও সফল ট্রায়াল শেষ করতে এই দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।
কঙ্গোয় ইবোলার তাণ্ডব, জারি বিশেষ জরুরি অবস্থা
বর্তমানে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডি আর) কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসটি প্রায় মহামারির রূপ ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, কঙ্গোতে এই ঘাতক ব্যাধির উপসর্গে এ পর্যন্ত অন্তত ১৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আরও প্রায় ৬০০ জনের শরীরে ইবোলার স্পষ্ট লক্ষণ শনাক্ত করা গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাবকে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে উচ্চমাত্রার মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডব্লিউএইচও। এর প্রেক্ষিতে গত ১৭ মে বিশ্বজুড়ে বিশেষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও, পরিস্থিতি এখনো বৈশ্বিক মহামারি স্তরে পৌঁছায়নি বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ভাসি মূর্তি আরও জানান, কঙ্গোতে উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে ইবোলা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যারা সবাই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি এবং উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দা।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও মার্কিন নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড়
কঙ্গোর সীমানা পেরিয়ে এই সংক্রমণ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র উগান্ডাতেও। দেশটির রাজধানী কামপালাতেও ইতোমধ্যে ২ জন নিশ্চিত ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এদিকে কঙ্গোর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ২৪৬ জন রোগীর মধ্যে ৬ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আক্রান্ত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্যের বিশাল আর্থিক অনুদান
কঙ্গোতে ইবোলার এই ভয়াবহ সংক্রমণ কঠোরভাবে দমনে এগিয়ে এসেছে যুক্তরাজ্য সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা ২ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা) জরুরি অনুদান দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এই বড় অঙ্কের অর্থ মূলত মাঠপর্যায়ের ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ ভাতা, উপদ্রুত অঞ্চলের সংক্রমণ রোধ এবং আক্রান্তদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার চিকিৎসা খাতে ব্যয় করা হবে।
ইবোলার প্রজাতি ও সংক্রমণের উৎস
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি নামের মোট ছয়টি রূপ বা প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কঙ্গো ও উগান্ডার বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতিটিকে দায়ী করা হচ্ছে।
মূলত মানুষ ও প্রাইমেট গোত্রীয় প্রাণী যেমন শিম্পাঞ্জি বা গরিলা এই ভাইরাসের প্রধান শিকার। ফলখেকো বাদুড়কে এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক বিবেচনা করা হলেও তারা নিজেরা এতে আক্রান্ত হয় না। এ ছাড়া বনমানুষ, হরিণ ও সজারুর মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।
রক্তক্ষরণ ও ভয়াবহ মৃত্যুর রূপ: কেন এটি এত বিপজ্জনক?
ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়, যার কারণে এটি অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় কম সংক্রামক হলেও এর মৃত্যুর হার অত্যন্ত ভয়াবহ। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্র বা অন্যান্য শারীরিক তরলের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলে এবং মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়ায়।
আক্রান্ত হওয়ার দ্বিতীয় দিন থেকেই রোগীর শরীরে তীব্র লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে:
হঠাৎ তীব্র জ্বর ও প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা
বমি ও মারাত্মক ডায়রিয়া
শেষ পর্যায়ে লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া
নাক, মুখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ
এই অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রোগীর মৃত্যু হওয়ায় একে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বলা হয়। ইবোলায় সাধারণত গড় মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ হয়ে থাকলেও, কঙ্গোর বর্তমান প্রাদুর্ভাবে এই মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।
সূত্র: বিবিসি