
তৃণমূলের অন্দরে ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে এক নজিরবিহীন তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে খোদ দলের অলিখিত দ্বিতীয় প্রধানের বাড়িকে ঘিরে। অবৈধ ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ এনে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি বাড়ি ঘিরে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
আজ বুধবার (২০ মে) কালীঘাট রোড ও হরিশ মুখার্জি রোডে অবস্থিত অভিষেকের ওই দুটি বিলাসবহুল বাড়ির মূল নির্মাণ নকশা জরুরি ভিত্তিতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা পৌরসভা (কেএমসি)।
পৌরসভার ‘৪০১ ধারা’ মোতাবেক পাঠানো ওই বিশেষ নোটিশে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভবন দুটির নির্মাণে মূল অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত অংশ যুক্ত করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত ও বর্ধিত অংশ নির্মাণের কোনো আইনি বৈধতা বা অনুমতি ছিল কি না, আর যদি থেকে থাকে তবে তা কার নির্দেশে করা হয়েছে—সে বিষয়ে আগামী সাত দিনের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। একই সাথে ভবনের বেআইনি অংশটি অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে ভেঙে ফেলারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নিজেই ওই অবৈধ অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে নোটিশে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে যে, বাড়ির মালিক নিজে কেন এই আইনবহির্ভূত অংশটি অপসারণ করবেন না, তার সুনির্দিষ্ট কারণও প্রশাসনকে জানাতে হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি যুক্তিসঙ্গত জবাব না আসে, তবে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বেআইনি অংশটি ভাঙার যাবতীয় খরচও সম্পূর্ণভাবে মালিকপক্ষকেই বহন করতে হবে।
তবে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে পাঠানো এই দুটি নোটিশের কোনোটিই সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ইস্যু করা হয়নি।
এর মধ্যে প্রথম নোটিশটি পাঠানো হয়েছে ১২১, কালীঘাট রোডের ঠিকানায়। সেখানে ভবনের মালিক হিসেবে নাম রয়েছে অভিষেকের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই বাড়িটি মূলত অভিষেকের মালিকানাধীন একটি হার্ডওয়্যার কোম্পানির নামে নথিভুক্ত রয়েছে।
অন্য দিকে, দ্বিতীয় নোটিশটি গেছে ১৮৮এ, হরিশ মুখার্জি রোডের বিখ্যাত ‘শান্তিনিকেতন’ নামের বহুতল ভবনে। এই বাড়িটিতেই সপরিবারে বসবাস করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নথিপত্র অনুযায়ী, এই বাড়িটির মালিক হিসেবে নাম রয়েছে তার পারিবারিক বিতর্কিত সংস্থা ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ কোম্পানির।
হাই-প্রোফাইল এই ঘটনাটি নিয়ে এখনো পর্যন্ত সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। তবে পৌরসভার শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং সম্পূর্ণ একটি রুটিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
উল্লেখ্য, বর্তমানে কলকাতা পৌরসভার শাসনভার ও পরিচালন বোর্ডও সম্পূর্ণভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলেই রয়েছে। এমনকি কলকাতার বর্তমান মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ অনুগামী হিসেবে গণ্য করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে খোদ অভিষেকের বাড়িতে পৌরসভার নোটিশ যাওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নবান্ন ও কালীঘাট সূত্রে খবর, এই নোটিশের বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষকে জরুরি তলব করেছেন।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে নিজের দায় এড়াতে চেয়েছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন যে, এই নোটিশের ব্যাপারে তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্যুতে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। বিল্ডিং বিভাগ কোন বেআইনি নির্মাণ ভাঙবে, সে সিদ্ধান্ত মেয়র নেন না। পুরসভার কমিশনার পদাধিকারবলে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।"
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পালাবদলের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধ বহুতল ও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান জোরদার করেছে বর্তমান প্রশাসন। তবে সাধারণ মানুষের অবৈধ বাড়ি ভাঙার হিড়িকের মাঝেই খোদ শাসকদলের শীর্ষ নেতার বাড়িতে এমন নোটিশ জারির ঘটনাটি এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।