
ভারতের রাজনীতিতে নারী নিরাপত্তা ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢালল এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তৃণমূল কংগ্রেসের নবনির্বাচিত লোকসভা সদস্য ও ওপার বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সায়নী ঘোষের মাথা কেটে আনতে পারলে নগদ ১ কোটি রুপি পুরস্কার দেওয়া হবে—এক বিজেপি নেতার এমন ভয়ানক ও প্রকাশ্য ঘোষণার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই খবর নিশ্চিত করেছে।
বিতর্কিত এই ভিডিওটি উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর জেলার সিকান্দরাবাদের। সেখানে স্থানীয় বিজেপি পৌর চেয়ারম্যান প্রদীপ দীক্ষিতকে একটি বিক্ষোভ সমাবেশে দাঁড়িয়ে সায়নী ঘোষের মাথা কাটার বিনিময়ে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত সায়নী ঘোষের একটি বহু পুরোনো সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলোর ক্ষোভের জেরে এই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
প্রাণনাশের এই হুমকির ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ সায়নী ঘোষ। নিজের ভেরিফাইড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মাথা কেটে আনতে ১ কোটি রুপির পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে—এমন প্রকাশ্য ঘোষণা দেখে আমি বিস্মিত।’
এই ইস্যুতে তিনি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ট্যাগ করে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন—নতুন ভারতে এটাই কি বিজেপি সরকারের ‘নারী শক্তি বন্দন’ বা নারী উন্নয়নের আসল রূপ? এ সময় তিনি ভারতের বহুল আলোচিত নারী সংরক্ষণ বিলের কার্যকারিতা নিয়েও কটাক্ষ করেন।
সায়নী ঘোষ ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও অভিযোগ করেন, সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি নারীদের নিরাপত্তাকে তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু বানালেও, এখন তাদের দলের নেতারাই একজন নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিকে প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি কলকাতা পুলিশ এবং উত্তর প্রদেশ পুলিশের প্রতি অভিযুক্ত বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর আহ্বান জানান। একই সাথে বিপদের দিনে তার পাশে দাঁড়ানো সব শুভাকাঙ্ক্ষীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি ভবিষ্যতেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করে যাবেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো বিতর্কের গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০১৫ সালের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে। সে সময় সায়নী ঘোষের প্রোফাইল থেকে শেয়ার হওয়া একটি পোস্টে সনাতন ধর্মের পবিত্র প্রতীক ‘শিবলিঙ্গ’ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে হিন্দু সংগঠনগুলো। অবশ্য তখনই সায়নী স্পষ্ট করেছিলেন যে, তার অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল এবং হ্যাকারদের কবল থেকে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পরপরই তিনি বিতর্কিত পোস্টটি মুছে ফেলেছিলেন।
কিন্তু বহু বছর আগের সেই পুরোনো বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন চলাকালীন ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বিষয়টি আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। তারই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার উত্তর প্রদেশের সিকান্দরাবাদে সায়নীর বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ওই বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালে ধারণ করা একটি ভিডিওতে বিজেপি নেতা প্রদীপ দীক্ষিতকে মাইক্রোফোনে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘যে সায়নী ঘোষের কাটা মাথা এনে দেবে, তাকে আমার পক্ষ থেকে ১ কোটি রুপি নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে।’
তবে এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর চারদিকে ছি ছি পড়ে গেলে সুর বদল করেছেন অভিযুক্ত বিজেপি নেতা। সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে প্রদীপ দীক্ষিত এখন দাবি করছেন যে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি একটি ‘ডিপফেক’ এবং তার কণ্ঠস্বর বিকৃত করে এই ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি