
ইনস্টাগ্রামের আলাপ থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের পরিণতি যে এত ভয়াবহ রূপ নেবে, তা হয়তো ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ। টানা ছয় দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে ভারতের পাঞ্জাবের উদীয়মান ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ইন্দর কৌর ওরফে যশিন্দর কৌরের (২৯) নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) ভোরের দিকে লুধিয়ানার নীলো খাল থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইকোনোমিক টাইমস।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ১৩ মে রাতে নিজের ‘ফোর্ড ফিগো’ গাড়িটি নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন ইন্দর। কিন্তু গভীর রাত পেরিয়ে গেলেও তিনি আর বাসায় ফেরেননি। স্বজনদের ধারণা, এই পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা সুখবিন্দর সিং নামের এক ব্যক্তি, যিনি অপরাধ সম্পন্ন করেই ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন।
নিহত গায়িকার ভাই যতিন্দর সিংয়ের দায়ের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৩ মে রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে ইন্দর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। কোনো হদিস না পেয়ে গায়িকার পরিবার মোগা জেলার ভালোঁর গ্রামের বাসিন্দা সুখবিন্দর সিং ওরফে সুখার ওপর সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করে। কারণ, সুখবিন্দর দীর্ঘদিন ধরে ইন্দরকে বিয়ে করার জন্য মানসিকভাবে প্রচণ্ড উত্ত্যক্ত ও চাপ দিয়ে আসছিল।
তদন্তে জানা যায়, আনুমানিক তিন বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সুখবিন্দরের সাথে ইন্দরের প্রথম পরিচয় ও পরে বন্ধুত্ব হয়। তবে কিছুদিন যেতেই ইন্দর জানতে পারেন যে সুখবিন্দর আসলে বিবাহিত এবং তার একটি সন্তানও রয়েছে। এই সত্য আড়াল করায় ইন্দর নিজেকে সম্পর্ক থেকে সরিয়ে নেন এবং সুখবিন্দরের বিয়ের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এই প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে না পেরে সুখবিন্দর মনে মনে চরম প্রতিহিংসা পুষে রাখে এবং ইন্দরকে বিভিন্নভাবে লাগাতার হুমকি দিতে শুরু করে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য উদঘাটন করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পেরেছে, ইন্দরকে চিরতরে সরিয়ে দিতে কানাডায় বসেই এক নিখুঁত ও রোমহর্ষক ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিল সুখবিন্দর। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে সে কানাডা থেকে সরাসরি ভারতে না এসে প্রথমে নেপালে নামে। এরপর নেপাল সীমান্ত গলে অত্যন্ত গোপনে পাঞ্জাবে প্রবেশ করে। পরিকল্পনা মাফিক, নিজের সহযোগীদের সাথে নিয়ে সে পথিমধ্যে বন্দুকের মুখে ইন্দরকে তার গাড়িটিসহ অপহরণ করে। এরপর তাকে নির্মমভাবে খুন করে লাশটি খালে ভাসিয়ে দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবার কানাডায় চম্পট দেয়।
এদিকে এই লোমহর্ষক ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা ও তদন্তের ধীরগতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছে নিহতের পরিবার। গায়িকার ভাই যতিন্দর আক্ষেপ করে জানান, গত ১৫ মে লুধিয়ানার জামালপুর থানায় সুখবিন্দর সিং ও তার সহযোগী করমজিৎ সিংয়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ যদি নিখোঁজের পরদিনই তৎপরতা দেখাত, তবে হয়তো আজ ইন্দরকে জীবিত ফিরে পাওয়া যেত।
পুলিশ ইতোমধ্যে নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সমরালার সিভিল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। জামালপুর থানার এসএইচও বলবীর সিং নিশ্চিত করেছেন যে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে আইনানুযায়ী সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ইন্টারপোলের সহায়তায় পলাতক মূল আসামি সুখবিন্দরকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ভারতে থাকা তার বাকি সহযোগীদের দ্রুত গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে।
উল্লেখ্য, অকালপ্রয়াত এই উদীয়মান পাঞ্জাবি গায়িকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আঞ্চলিক লোকসংগীতের জন্য দারুণ সমাদৃত ছিলেন। 'সোনে দি চিড়ি', 'জিজা', 'সোহনা লাগদা' এবং 'দেশি সিরে দা'-এর মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করছিলেন ইন্দর।