
ইউরোপের মূলধারার গণমাধ্যমে আন্তর্জাতিক এক শীর্ষ নেতাকে ব্যঙ্গাত্মক রূপে উপস্থাপন করাকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এক বৈশ্বিক বিতর্কের ঝড় উঠেছে। নরওয়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র 'আফতেনপোস্তেন'-এ (Aftenposten) প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক কার্টুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একজন ‘সাপুড়ে’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
উক্ত কার্টুনটিতে দেখা যায়—প্রধানমন্ত্রী মোদি সাপের মতো দেখতে একটি জ্বালানি পাম্পের পাইপ বা নজল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু কার্টুনই নয়, ওই দৈনিকটিতে প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী বিশ্লেষণমূলক লেখায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘চতুর এবং কিছুটা বিরক্তিকর মানুষ’ হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এই ব্যঙ্গচিত্র ও কলামটি প্রকাশ্যে আসার পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অসংখ্য ভারতীয় নেটিজেন। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তারা এটিকে স্পষ্ট ‘বর্ণবাদী’ ও ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা’র নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন। সমালোচকদের মূল অভিযোগ—পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে যেভাবে ‘সাপ ও সাপুড়ের দেশ’ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট নেতিবাচক ছকে (স্টেরিওটাইপ) বন্দি করে রাখত, এই কার্টুনের মাধ্যমে সেই পুরোনো ও আপত্তিকর মানসিকতাকেই আবার নতুন করে সামনে আনা হয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকদের দাবি—পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি বড় অংশ বিগত বহু বছর ধরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতিবাচক ও সেকেলে প্রতীকের সাহায্যে উপস্থাপন করে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে এসে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান শক্ত হওয়ায় এই ধরনের আপত্তিকর চিত্রায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা আরও জোরালো ও সুসংহত হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সাম্প্রতিক বিতর্কের নেপথ্যে নরেন্দ্র মোদির নরওয়ে সফরের সময় ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনারও যোগসূত্র রয়েছে। সফরকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একজন নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকের করা একটি সরাসরি ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে। ওই প্রশ্নটির জবাব না দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে অনলাইন দুনিয়ায় তুমুল চর্চা শুরু হয় এবং বিষয়টি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। যদিও উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্নের লিখিত ও আলাদা জবাব দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নরওয়ের পত্রিকার এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বজুড়ে আবারও গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের পরিধি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার সীমারেখা ঠিক কতটুকু—তা নিয়ে নতুন করে তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে (World Press Freedom Index) বর্তমানে নরওয়ে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ স্থানটি দখল করে আছে। পক্ষান্তরে, ভারতের অবস্থান এই আন্তর্জাতিক সূচকে ক্রমাগত পিছিয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক থেকে ভারতের অবস্থান ১৫৪তম থেকে আরও তিন ধাপ নিচে নেমে ১৫৭-এ এসে ঠেকেছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম ফোরামগুলোতে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে।