
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে এখন কেবলই বারুদের গন্ধ। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সামরিক সংঘাতের জেরে এই মুহূর্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে গোটা বিশ্বে। এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ পরিহার করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের এবং উত্তেজনা প্রশমনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
আজ বুধবার (৯ জুন) এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিং জিয়ান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা নিয়ে কথা বলেন। লিং জিয়ান বলেন, ‘ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে চীন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
তিনি বিশ্বশান্তির স্বার্থে উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত শান্ত থাকা এবং সংযম প্রদর্শন করা, সংঘাতকে আরও তীব্র করা ও পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটানো থেকে বিরত থাকা। উত্তেজনা কমিয়ে আনার জন্য তাদের বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
চীনের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যার ঠিক আগেই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের মূল ভূখণ্ডের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে রাতভর বিমান হামলা চালায়।
আমেরিকার এই আগ্রাসনের জবাবে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পালটা হুংকার ছেড়েছে। তারা দাবি করেছে, মার্কিন হামলার তাৎক্ষণিক জবাবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ওয়াশিংটনের বিমান ও নৌঘাঁটিসহ মোট ২১টি কৌশলগত সামরিক স্থাপনায় একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাতের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
আজ বুধবার ভোরের দিকে আইআরজিসির তরফ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের ছোঁড়া দূরপাল্লার নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জর্ডানে অবস্থিত আমেরিকার আল আজরাক বিমানঘাঁটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) স্টিলথ ফাইটার জেট রাখার সুরক্ষিত হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রও রয়েছে।
তবে জর্ডানের রাজকীয় সেনাবাহিনী ইরানের এই দাবি আংশিক নাকচ করে জানিয়েছে, ইরান থেকে ধেয়ে আসা পাঁচটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝ আকাশেই নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করেছে। জর্ডানীয় সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা হলেও সেগুলোর জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়েছে, তবে এতে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ‘আলি আল সালেম’ ঘাঁটিকে টার্গেট করে একঝাঁক আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে এটিকে ‘মার্কিন আগ্রাসনের’ যোগ্য জবাব হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে আইআরজিসি জানায়, নতুন কোনো হামলার জবাবে তাদের বাহিনী ‘চূর্ণবিচূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক’ প্রতিক্রিয়া জানাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী পরিস্থিতির দায় মার্কিন বাহিনীকেই বহন করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
অপর এক দাপ্তরিক বিবৃতিতে রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, তারা দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করা আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ (MQ-9) ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইনে নোঙর করে রাখা মার্কিন নৌবাহিনীর কুখ্যাত পঞ্চম নৌবহরকে (Fifth Fleet) লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্যমতে, দক্ষিণ ইরানের জাস্ক, সিরিক ও কেশম এলাকায় আমেরিকার চালানো সাম্প্রতিক বিমান হামলার বদলা নিতেই এই অলআউট অপারেশন চালানো হয়েছে। মার্কিন হামলায় সিরিক অঞ্চলের একটি প্রধান টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বামানি এলাকায় দুটি বড় পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছিল।
আজ স্থানীয় সময় রাত আড়াইটার দিকে ইরানের নৌবাহিনী মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের বিরুদ্ধে এই ড্রোন হামলা শুরু করে। রণক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সংঘর্ষ এখনও চলছে।’ একই সঙ্গে হামলা অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থার সত্যতা স্বীকার করে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরের দিকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের সীমানায় প্রবেশ করা বেশ কয়েকটি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ আকাশযান ও ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তবে ঠিক কোথা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছিল, সে বিষয়ে কুয়েত বিস্তারিত কিছু জানায়নি। অন্য দিকে, প্রতিবেশী দেশ বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য বিমান হামলার হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে দেশজুড়ে জরুরি সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে মার্কিন হামলার পর আজ বুধবার ভোরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা বা হুমকি জবাবহীন থাকবে না।’
ওয়াশিংটনের কড়া সমালোচনা করে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে আরাগচি আরও বলেন, ‘আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কোনো হামলা বা হুমকির জবাব না দিয়ে থাকবে না।’ একই সঙ্গে তিনি মার্কিন সেনাদের এই অঞ্চল ছাড়ার আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যাও।’ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘পারস্য উপসাগরের ইতিহাসে বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের ভয়াবহ পরিণতির বহু অধ্যায় রয়েছে।’