
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা আইইএলটিএস (IELTS)-এর কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের কারিগরি বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে। সফটওয়্যারের এই মারাত্মক ভুলের কারণে বিশ্বব্যাপী ৬২ হাজার ৭৯৪ জন পরীক্ষার্থীর কাছে ভুল ফলাফল চলে গিয়েছিল। এই চরম গাফিলতির দায়ে আইইএলটিএস পরীক্ষার অন্যতম আয়োজক ও অংশীদার প্রতিষ্ঠান ‘কেমব্রিজ ইংলিশ’-কে ৮ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৬ হাজার ২০০ টাকা) জরিমানা করেছে যুক্তরাজ্যের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ‘অফকোয়াল’ (Ofqual)।
অফকোয়ালের সরবরাহ করা তথ্য মোতাবেক, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে আইইএলটিএস-এর খাতা মূল্যায়ন প্রযুক্তিতে এই ত্রুটি লুকিয়ে ছিল। এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৭ লাখ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী আইইএলটিএস পরীক্ষায় বসেন। এদের মধ্যে ৯৩ হাজার ৮৬৫টি উত্তরপত্র ভুল পদ্ধতিতে যাচাই করা হয়েছিল, যার সরাসরি খেসারত দিতে হয়েছে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে।
পরবর্তীতে এই ত্রুটিপূর্ণ ফলাফলগুলো পুনরায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে সংশোধন করা হয়। সংশোধিত এই নতুন ফলাফলে দেখা যায়, ২০ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি পরীক্ষার্থীর মূল ‘ব্যান্ড স্কোর’ পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে, ১ হাজার ১১৫ জন পরীক্ষার্থীকে প্রথম দফায় ভুলবশত বেশি স্কোর দেওয়া হয়েছিল, যা পরে তাদের প্রকৃত যোগ্যতা অনুযায়ী কমিয়ে সমন্বয় করা হয়।
সবচেয়ে সংকটে পড়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ভিসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘সিকিউর ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট’ (SELT) দেওয়া ১ হাজার ১০৮ জন পরীক্ষার্থী। এই গুরুতর ভুলের কারণে চারজন পরীক্ষার্থীর ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, পরবর্তীতে তারা পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় স্কোর তুলতে সক্ষম হন।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই কারিগরি ত্রুটি কেমব্রিজ ইংলিশের নিজস্ব কোনো পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং ব্যবস্থায় ধরা পড়েনি। অবশেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের সিস্টেম আপডেট করার সময় এই সফটওয়্যার বাগটি প্রথম নজরে আসে এবং প্রতিষ্ঠানটি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অফকোয়ালকে বিষয়টি অবহিত করে।
পরীক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি নিয়ে অফকোয়ালের ডেলিভারি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক আমান্ডা সোয়ান কড়া ভাষায় বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষ এই পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতার কারণে পরীক্ষার্থী এবং ফল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষই বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছে। আমাদের এই বিশাল অঙ্কের জরিমানা সেই গাফিলতিরই প্রতিফলন।’
এদিকে নিজেদের এই ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও ত্রুটি অকপটে স্বীকার করে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে কেমব্রিজ ইংলিশ। এই যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করা, ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, সার্বক্ষণিক সেবার জন্য কাস্টমার সাপোর্ট হাব তৈরি এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য নতুন প্রযুক্তির নিরাপত্তাবলয় গড়তে সংস্থাটি ইতিমধ্যেই ৬০ লাখ পাউন্ডের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা) বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
আইইএলটিএস কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, "ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে আবারও পরীক্ষা দেওয়া অথবা সম্পূর্ণ ফি রিফান্ড (ফেরত) করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।"
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে আইইএলটিএস পরীক্ষাটি যৌথ ও ত্রিমুখী অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা করে ব্রিটিশ কাউন্সিল, আইডিপি আইইএলটিএস এবং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট।