
সিন্ধু নদ অববাহিকার পানিকে ভারত সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, নতুন দিল্লির এমন একতরফা ও আগ্রাসী পদক্ষেপের কারণে পাকিস্তানের সামগ্রিক খাদ্য, পানি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ভারতের এই উস্কানিমূলক তৎপরতাকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে দ্রুত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। আজ শুক্রবার (১৯ জুন) জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমেদ কলম্বিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি লিওনোর জালাবাতা তোরেসের কাছে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ প্রতিবাদপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছেন। এই পত্রে ভারতের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ (আইডব্লিউটি) লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে নতুন দিল্লিকে আন্তর্জাতিক আইনের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন, এই প্রতিবাদপত্রের মাধ্যমে চেনাব নদীর ওপর ভারতের নির্মাণাধীন দুটি সম্পূর্ণ বেআইনি অবকাঠামো প্রকল্পের দিকে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ভারত এই প্রকল্পগুলোর আড়ালে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিবর্তন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমের নদীগুলোর অববাহিকা সুরক্ষার নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখায়।
একচেটিয়া পানি-আধিপত্যের হাতিয়ার ১৭টি প্রকল্প
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে পাঠানো চিঠিতে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ভারতের এই চুক্তি লঙ্ঘনজনিত কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমেদ কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিরসনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ববর্তী প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে ভারতের ক্রমাগত অস্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করার বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
এর আগে গত এপ্রিল মাসেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে অনুরূপ একটি প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছিল, যেখানে ভারতের পক্ষ থেকে সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার এক বছর পূর্তিতে এর মারাত্মক মানবিক ও নিরাপত্তা বিপর্যয়গুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার এক বক্তৃতায় ইসহাক দার স্পষ্টভাবে বলেন যে, সিন্ধু নদ অববাহিকায় ভারতের পরিকল্পিত অন্তত ১৭টি জলবিদ্যুৎ ও পানি নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প মূলত নতুন দিল্লিকে এই অঞ্চলে একচেটিয়া পানি-আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার সরবরাহ করবে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তিটি দীর্ঘকাল ধরেই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। বিশেষ করে গত ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের পর ভারতের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে এই চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অতি সম্প্রতি ভারতের জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাতিল এক উস্কানিমূলক বক্তব্যে বলেন যে, তার দেশ এমনভাবে কাজ করছে যাতে পানির একটি ফোঁটাও পাকিস্তানে প্রবাহিত না হতে পারে। যার জবাবে পাকিস্তান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যে, আন্তঃসীমান্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে গণ্য হবে।
১৯৬০ সালের চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই সিন্ধু পানি চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদের অববাহিকার পানি বণ্টন সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বের তিনটি নদী যথাক্রমে রাভি, বিয়াস ও সতলেজের পানির ওপর ভারতকে পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয় এবং পশ্চিমের তিনটি প্রধান নদী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের পানির সিংহভাগ পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। বিগত দিনে একাধিক যুদ্ধ ও চরম সংকটের মধ্যেও এই চুক্তিটি টিকে থাকলেও গত ২০২৫ সালে ভারত তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলে এই সম্পর্কে চরম ফাটল ধরে।
ভারত অবশ্য এই চুক্তি স্থগিতের পেছনে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহালগামে ২৬ জন পর্যটক নিহতের ঘটনাকে দায়ী করে কোনো প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছিল, যা ইসলামাবাদ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। পরবর্তীতে গত ২০২৫ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিকারী সংস্থা পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন বা পিসিএ একটি সম্পূরক রায়ে জানিয়ে দেয় যে ভারত এককভাবে এই আন্তর্জাতিক চুক্তি স্থগিত রাখতে পারে না, যদিও ভারত এখনো দাবি করে আসছে যে পাকিস্তান কথিত সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা এই চুক্তি স্থগিত রাখবে।
গত মাসে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের আরেকটি সম্পূরক রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল, যা ইসলামাবাদের অবস্থানকে সমর্থন করে স্পষ্ট করে যে এই চুক্তিটি পশ্চিমের নদীগুলোর ওপর ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর সুনির্দিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। কাশ্মীরের বিতর্কিত রাতলে ও কিষেণগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা নিয়ে তৈরি হওয়া এই প্রযুক্তিগত বিরোধের রায়ে বলা হয় যে ভারত অবাস্তব ধারণক্ষমতা বা কাল্পনিক চাহিদার অজুহাত দেখিয়ে জলাধারে পানির পরিমাণ বা উচ্চতা বাড়াতে পারবে না।
১ আগস্ট থেকে ভারতের নতুন প্রকল্প ও পাকিস্তানের ক্ষোভ
এদিকে ভারতের অন্যতম সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি টিভি১৮ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে ভারত আগামী ১ আগস্ট থেকে হিমাচল প্রদেশে চেনাব নদীর ওপর তাদের প্রস্তাবিত লিংক-৩ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে চেনাব নদী থেকে উদ্বৃত্ত পানি বিয়াস অববাহিকায় সরিয়ে নেওয়া হবে এবং সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের তথ্য অনুযায়ী এতে ভারতের আনুমানিক ২৬.২ বিলিয়ন রুপি ব্যয় হবে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ৪ জুন আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রেবি ভারতের এই নদী সংযোগ প্রকল্পকে সিন্ধু পানি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের এক চরম লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিশ্চিত করেন যে ভারত বার্ষিক ১.৯ মিলিয়ন একর-ফুট পানি চেনাব থেকে বিয়াস নদীতে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বান করেছে। এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় পানির এই ধরনের অবৈধ রূপান্তর কেবল সিন্ধু পানি চুক্তিরই পরিপন্থী নয়, বরং এটি ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল অব ট্রিটিজ এবং ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের জলপথ কনভেনশনের মূল আন্তর্জাতিক আইনি নীতিমালারও পরিপন্থী। মুখপাত্র একই সঙ্গে কাশ্মীরের রিয়াসি জেলায় অবস্থিত সালাল বাঁধের তলানি পরিষ্কার বা পলি অপসারণের ভারতীয় পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে এটি ভারতকে এমন পানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেবে যা সিন্ধু চুক্তি বা ১৯৭৮ সালের সালাল চুক্তি কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।
সূত্র: ডন