
মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে ভেনেজুয়েলা। রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এ ভূকম্পনকে দেশটির গত ১২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কায় শুরু হয়েছে উদ্ধার অভিযান, জারি করা হয়েছে সুনামি সতর্কতাও।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর কারাকাস থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমার এলাকায় ৭.৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী আরেকটি কম্পন অনুভূত হয়।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, এ ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং বড় পরিসরের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারিনাস প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি উইলমার আজুয়াখের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, কারাকাসের সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ছে এবং আতঙ্কিত মানুষ নিরাপদ স্থানের খোঁজে ছুটছেন।
রাজধানীর বাসিন্দা ৫৪ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা ওদালিস এসকালোনা বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘সিঁড়ি ভেঙে পড়েছিল, পুরো দেয়ালে ফাটল ধরে যায়। ছাদ থেকে বিভিন্ন জিনিস পড়ে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।’
ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কম্পনের কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুই প্রদেশের রাজধানী সান ফেলিপের নিকটে। দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ইউমারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ‘ব্যাপক প্রাণহানি ও বিস্তৃত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই দুর্যোগের প্রভাব বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শিগগিরই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার ক্যারিবীয় উপকূলসংলগ্ন এলাকায় ধারাবাহিক এ ভূমিকম্পের পর পুরো অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ইউএসজিএস আরও জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। উপকূলীয় শহর মোরনের পশ্চিমে ছিল এর কেন্দ্রস্থল। শক্তিশালী কম্পনে রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক ঝাঁকুনি অনুভূত হয় এবং একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়ার খবর পাওয়া যায়।
ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণের কাজ শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় ধুলার ঘন মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কংক্রিটের অংশ ভেঙে পড়ছে।
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া বা আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। এদিকে সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত ক্ষতি এবং কার্যক্রমে বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে।
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেয়ো জানিয়েছেন, প্রবল ভূমিকম্পে বহু বাড়িঘর ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক, দমকল ও পুলিশসহ সব নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা সংস্থা ঘটনাস্থলে কাজ করছে।’
তিনি রাজধানীর আলতামিরা এলাকার পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। সেখানে কয়েকটি বহুতল ভবনের অংশবিশেষ ধসে পড়েছে, যার ফলে বাইরে থেকে ভবনের অভ্যন্তরের আসবাবপত্রও দেখা যাচ্ছে।
সম্ভাব্য আফটারশকের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কাবেয়ো জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাইকে রাস্তায় অবস্থান করতে, শিশু ও বয়স্কদের খেয়াল রাখতে এবং শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। উদ্ধার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।’
এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র (পিটিডব্লিউসি) ভেনেজুয়েলার উপকূল, পাশাপাশি আরুবা, বোনাইরে ও কুরাসাও দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি হুমকি সতর্কতা জারি করেছে।
একই সঙ্গে পুয়ের্তো রিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের জন্যও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক ঢেউয়ের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।