
লেবাননে হিজবুল্লাহর লাগাম টানতে সিরিয়াকে ব্যবহার করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এমন একের পর এক মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। দীর্ঘ সামরিক দখলদারিত্বের তিক্ত অতীত মনে করে লেবানন যখন নতুন সিরীয় হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় কাঁপছে, তখন বৈরুতকে আশ্বস্ত করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে দামেস্ক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে মোকাবিলার দায়িত্ব সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ওপর ছেড়ে দেওয়ার আভাস দিচ্ছেন। যদিও দামেস্ক এই পরিকল্পনা সরাসরি নাকচ করেছে, তবুও লেবাননে পুনরায় সিরীয় সেনার অনুপ্রবেশের আতঙ্ক মাথাচারা দিয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য অবস্থান সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন দূত টম ব্যারাকের আগের বক্তব্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ব্যারাক লেবাননে সেনা পাঠাতে দামেস্কের ওপর মার্কিন চাপের খবরকে “মিথ্যা ও অসঠিক” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
সর্বশেষ গত ২১শে জুন ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হিজবুল্লাহ নিধনে ইসরায়েলের ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ভবন না ভেঙে তারা কিছুই করতে পারে না। আমি এটা সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার কাছাকাছি চলে এসেছি।” তবে ‘হস্তান্তর করা’ বলতে ট্রাম্প ঠিক কী বুঝিয়েছেন—সামরিক অভিযান নাকি রাজনৈতিক মধ্যস্থতা কিংবা কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ—তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
মার্কিন চাপের নেপথ্যে
এই আলোচনার সূত্রপাত গত ১৭ই মার্চ, যখন রয়টার্স জানায় যে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করতে পূর্ব লেবাননে সেনা মোতায়েনের জন্য সিরিয়াকে উদ্বুদ্ধ করছে ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিরিয়া এতে জড়াতে চায়নি; কারণ তাদের ভয় ছিল এর ফলে তারা কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপাক্ষিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথম এই প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন ও সিরীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় বিষয়টি আবারও সামনে আসে।
মিডল ইস্ট আই (এমইই)-কে একটি সিরীয় সূত্র জানিয়েছে, এই খবর ছড়ানোর পর শারা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের মধ্যে বৈঠক হয়। সূত্রটির ভাষায়, “উপস্থিত ব্যক্তিরা একমত হয়েছেন যে লেবাননে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা সিরিয়ার নেই।”
লেবাননের একটি উচ্চপদস্থ সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, দামেস্ক সীমান্ত পার হয়ে কোনো সেনা পাঠাবে না বলে বৈরুতকে নিশ্চিত করেছে। সিরীয় কর্তৃপক্ষ এই মার্কিন চাপ সামলাতে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সহযোগিতার আশা করছে। চাপের মুখে শারা ওয়াশিংটনের কাছে এমন কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, যা পূরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায় অসম্ভব।
ট্রাম্পের ধারাবাহিক বার্তা ও জি৭ সম্মেলন
গত ৫ই জুন এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে ট্রাম্প প্রথম এই বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি শারার প্রশংসা করে বলেন, সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি “সাহায্য করতে আগ্রহী”।
এরপর ১৬ই জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করে বলেন, “আই সাজেস্টেড টু ইসরায়েল দ্যাট দে লেট সিরিয়া হ্যান্ডেল হিজবুল্লাহ, বিকজ ফ্রাঙ্কলি, আই থিংক দে ডু এ বেটার জব অফ ইট।” তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, শারা সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে একটি “অসাধারণ কাজ” করেছে এবং হিজবুল্লাহকে “পছন্দ করে না”। পরদিন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে তিনি শারার সঙ্গে হিজবুল্লাহ নিয়ে কথা বলেছেন, তবে সিরীয় প্রেসিডেন্ট রাজি হয়েছেন কিনা তা পরে জানাবেন।
সামরিক ভূমিকা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান দামেস্কের
ক্রমবর্ধমান জল্পনা রুখতে গত ১১ই জুন শারা লেবাননে সিরীয়দের প্রবেশের খবরকে স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দেন। সিরিয়ার রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা আহমেদ মুওয়াফফাক জাইদান আল আরাবিয়াকে জানান, ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব দিলেও দামেস্ক লেবাননে কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেছে।
২১শে জুন আল মাশহাদ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শারা বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে সিরীয় বাহিনী “আগামীকাল সকালে” লেবাননে প্রবেশ করবে। শারা স্পষ্ট করেন যে, সিরিয়ার অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধ ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ বন্ধ করা। তাদের লক্ষ্য হলো লেবানন রাষ্ট্রকে সমর্থন করা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, সামরিক উপায়ে নয়। শারা বলেন, “আমরা লেবানন ও সিরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক পথ খুঁজছি, সামরিক পথ নয়।”
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হিজবুল্লাহর ভূমিকা তার ভাষায় একটি “গভীর সিরীয় ক্ষত” রেখে গেলেও, দুই দেশের স্বার্থে তিনি তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসতে রাজি আছেন। সিরিয়ার এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে লেবাননের রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন বলেছেন, এটি ইতিবাচক এবং এর ফলে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। বৈরুতের সাময়িক উদ্বেগ কাটলেও, ট্রাম্পের অনড় অবস্থান হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই