
পাকিস্তানের বৃহত্তম কিন্তু সবচেয়ে কম জনবহুল এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘ দিন ধরে জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সশস্ত্র সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অভ্যন্তরীণ সংকটে ‘চীন’ একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক বা ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীনের বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে বেলুচিস্তান এখন বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অঞ্চল।
নিচে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উৎসের ভিত্তিতে বেলুচিস্তান সংকটে চীনের ভূমিকা, স্বার্থ, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পটভূমি ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকেই বেলুচিস্তানের জনগণ ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সম্পদ বণ্টন, স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একাধিকবার সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছে। তবে ২০১৩ সালে চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (CPEC) ঘোষণার পর এই সংকট এক নতুন মাত্রা পায়। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ, পাকিস্তান সরকার তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ (গ্যাস, সোনা, তামা) চীনের কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিচ্ছে, যার সুফল স্থানীয় জনগণ পাচ্ছে না। ফলে কয়েক দশকের পুরোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এখন চীন-বিরোধী সশস্ত্র রূপ ধারণ করেছে।
২. বেলুচিস্তানে চীনের মূল স্বার্থ
বেলুচিস্তানে চীনের স্বার্থ মূলত দ্বিমুখী: অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত।
মালাক্কা সংকটের বিকল্প (Alternative Route): চীনের আমদানিকৃত তেলের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনে পৌঁছায়। যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় মার্কিন নৌবাহিনী মালাক্কা প্রণালী অবরোধ করলে চীনের অর্থনীতি অচল হয়ে যেতে পারে। বেলুচিস্তানের গোয়াদার বন্দর ব্যবহার করে চীন সরাসরি স্থলপথে জিনজিয়াং প্রদেশে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে, যা দূরত্ব প্রায় ১২,০০০ কিমি থেকে কমিয়ে মাত্র ২,৩৯৫ কিমিতে নামিয়ে আনবে।
আরব সাগরে প্রবেশাধিকার ও ভারতকে ঘেরাও (String of Pearls): গোয়াদার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকায় বেইজিং সরাসরি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থান শক্ত করতে পারছে। এটি ভারতকে নৌ-কৌশলগতভাবে চাপে রাখার একটি মোক্ষম হাতিয়ার।
খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: বেলুচিস্তান সোনা, তামা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ। চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো (যেমন সান্দাক তামা-সোনা প্রকল্প) এই সম্পদ উত্তোলনে সরাসরি যুক্ত।
৩. চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ও ক্ষেত্র
পাকিস্তানের মোট ৬২-৬৫ বিলিয়ন ডলারের CPEC বিনিয়োগের একটি বড় অংশ সরাসরি বেলুচিস্তানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
গদর গভীর সমুদ্রবন্দর এটি CPEC-এর ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প, যা চীন লিজ নিয়ে পরিচালনা করছে।
অবকাঠামো ও জ্বালানি: গোয়াদারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) নির্মাণে চীন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে পারাপারকারী মহাসড়ক ও রেলপথ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন।
৪. সমর্থিত পক্ষ এবং চীনের কৌশল
এই সংকটে চীনের নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার। চীন পাকিস্তান রাষ্ট্র ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সমর্থন: বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং সেখানে যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের তীব্র বিরোধী।
নিরাপত্তা কৌশল: বেলুচিস্তানে কর্মরত হাজার হাজার চীনা প্রকৌশলী ও কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী চীনাদের সুরক্ষায় বিশেষ ‘Special Security Division’ (SSD) গঠন করেছে।
স্থানীয়দের বাদ দিয়ে কাজ করার নীতি: চীন স্থানীয় বেলুচ শ্রমিকদের ওপর আস্থা না রেখে নিজেদের প্রকৌশলী ও বাইরের প্রদেশের (মূলত পাঞ্জাব) শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে, যা স্থানীয় অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৫. চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর। ভূমিকা
চীনের এই বিশাল উপস্থিতি বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA), বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF) এবং সাম্প্রতিক সময়ের বালুচ জাতীয়তাবাদী জোটের (যেমন: Baloch Nationalist Army - BNA) মতো সশস্ত্র দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে। তারা চীনকে একটি "উপনিবেশবাদী শক্তি" হিসেবে আখ্যায়িত করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (বিশেষ করে ২০২৪-২০২৬ সময়কালে) চীনা নাগরিকদের ওপর আত্মঘাতী ও গেরিলা হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গোয়াদার বন্দর, চীনা কনভয় এবং করাচি ও লাহোরে চীনা শিক্ষকদের ওপর বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল হামলা হয়েছে, যা বেইজিংকে চরম উদ্বেগে ফেলেছে।
৬. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
চীন বেলুচিস্তান নিয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে পিছু হটতে নারাজ, তবে তাদের কৌশলে কিছু পরিবর্তন আসছে:
নিরাপত্তায় সরাসরি হস্তক্ষেপের গুঞ্জন: পাকিস্তান সেনাবাহিনী চীনাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে চীন নিজের বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা (PMSCs) বা আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েনের জন্য ইসলামাবাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আঞ্চলিক পরাশক্তিদের সম্পৃক্ততা: চীন আশঙ্কা করে যে, বেলুচ বিদ্রোহীদের ভারত বা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি মদদ দিচ্ছে যাতে CPEC প্রকল্প ব্যর্থ হয়। ফলে বেইজিং ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ফাঁদ (Debt Trap) ও স্থবিরতা: পাকিস্তানের চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রমাগত হামলার কারণে অনেক CPEC প্রকল্প বর্তমানে ধীরগতির বা স্থবির হয়ে পড়েছে। চীন এখন নতুন বিনিয়োগের চেয়ে পুরোনো বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং বকেয়া আদায়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বেলুচিস্তান সংকটে চীন কোনো মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং তারা সরাসরি পাকিস্তান সরকারের অংশীদার এবং বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। বেইজিংয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুরোপুরি নির্ভর করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কতটা সফলভাবে বেলুচ অসন্তোষ দমন করতে পারে এবং চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে বেলুচিস্তান চীনের বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর সবচেয়ে দুর্বল বিন্দু বা "অ্যাকিলিস হিল" (Achilles' heel) হিসেবেই থেকে যাবে।